মুসলিম বন্ধুর শেষ বিদায়ে অঝোরে কাঁদলেন বৌদ্ধ বন্ধু

পাহাড়ের পাদদেশে কবরস্থানে চলছে জানাজা। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মুসল্লিরা। সামনে ইমাম, তার সামনে খাটিয়ায় শায়িত আরিফুল ইসলামের নিথর দেহ। একটু দূরে একটি গাছের নিচে হাতে ফুল নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে এক তরুণ। তার চোখে পানি, মুখে শোকের ছাপ। তিনি অনু চাকমা- ধর্মে বৌদ্ধ, আরিফুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

বন্ধুর জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই তার। তাই দূরে দাঁড়িয়েই শেষবারের মতো বন্ধুকে বিদায় জানাতে এসেছেন। একপর্যায়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন অনু। কখনো আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন, কখনো ফুল হাতে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকছেন। দৃশ্যটি উপস্থিত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

সম্প্রতি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গামারীঢালা এলাকার বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম হঠাৎ মারা যান। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে পাশের দীঘিনালা উপজেলা থেকে ছুটে আসেন বন্ধু অনু চাকমা। ধর্ম আলাদা হওয়ায় জানাজার কাতারে দাঁড়াতে পারেননি; কিন্তু বন্ধুর শেষ বিদায়ে নিজেকে দূরে রাখতে পারেননি তিনি।

জানাজা শেষে বিষয়টি নজরে আসে আরিফুলের বাবা রফিকুল ইসলামের। তিনি এগিয়ে যান অনুর কাছে। এরপর দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছেলেকে হারানোর শোকে কাতর বাবার সাথে বন্ধুকে হারানোর বেদনায় কাঁদছিলেন অনুও।

এ সময় রফিকুল ইসলাম আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার ছেলের জন্য তার বন্ধু এসেছে। সে বন্ধুর জন্য প্রার্থনা করছে। বন্ধুর জন্য হলেও আমার ছেলেকে ক্ষমা করে দিও।’

বাবা ও বন্ধুর এই আবেগঘন মুহূর্তে কেঁদে ফেলেন সেখানে উপস্থিত অনেকেই। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা পেরিয়ে দুই বন্ধুর সম্পর্কের এই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়- মানুষের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরিচয় কখনো কখনো ধর্ম বা সম্প্রদায় নয়, বন্ধুত্ব ও মানবিকতা।

পাহাড়ে নানা জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষের বসবাস। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির এমন ছোট ছোট ঘটনাই সেই সহাবস্থানের মানবিক ছবি তুলে ধরে। আরিফুল ও অনুর বন্ধুত্বের এই গল্পও হয়ে থাকল তেমনই এক হৃদয়ছোঁয়া স্মৃতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *