সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে চারজনকে নিয়োগ, আয়া পদের ‘দাম’ ৪ লাখ!

ভোলার লালমোহন উপজেলার উত্তর চরভূতা রহিমপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে চারটি পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আলমগীরের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, আয়া পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এক আবেদনকারীর কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। নিয়োগে অনিয়ম, জালিয়াতি, অর্থ লেনদেন এবং বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে ফেলার অভিযোগ তুলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন (দুদক) কমিশনে প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা হয়েছে। দুদক এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে। দুদকের চিঠির প্রেক্ষিতে অভিযোগগুলো সরেজমিন তদন্ত করে সুস্পষ্ট মতামতসহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মাউশি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধান শিক্ষক প্রকৃতপক্ষে অপরাধী হয়ে থাকলে বিধি অনুযায়ী তিনি শাস্তি পাবেন।’

দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যালয়টির জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতাদের একজন মো. মফিজুল ইসলাম একসময় ব্যবস্থাপনা কমিটির অভিভাবক সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ৭ আগস্ট তাকে কমিটির সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

কমিটির সদস্য থাকাকালে তার পুত্রবধূকে বিদ্যালয়ের আয়া পদে নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস দেন প্রধান শিক্ষক  মহিউদ্দিন আলমগীর। এ আশ্বাসে তার কাছ থেকে নগদ ৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়। বিষয়টি গোপন রাখতেও তাকে অনুরোধ করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ

স্বাক্ষর জাল করে চারজনকে নিয়োগ
বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, দাতা, প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যান্য সদস্যের স্বাক্ষর জাল করে প্রধান শিক্ষক পরিচ্ছন্নতাকর্মী, অফিস সহায়ক, নৈশপ্রহরী ও আয়া পদে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। এসব নিয়োগের মাধ্যমে অন্তত ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আলমগীর।

বিদ্যালয়টির জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতাদের একজন মো. মফিজুল ইসলাম একসময় ব্যবস্থাপনা কমিটির অভিভাবক সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ৭ আগস্ট তাকে কমিটির সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। কমিটির সদস্য থাকাকালে তার পুত্রবধূকে বিদ্যালয়ের আয়া পদে নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস দেন প্রধান শিক্ষক  মহিউদ্দিন আলমগীর। এ আশ্বাসে তার কাছ থেকে নগদ ৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়। বিষয়টি গোপন রাখতেও তাকে অনুরোধ করা হয়।

জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ৫ আগস্টের পর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আবদুল হান্নানের স্বাক্ষর জাল করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. নাঈম, অফিস সহায়ক মো. জুবায়ের, নৈশ প্রহরী মো. শামীম এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী ময়ফুল বেগমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চারজনকে ব্যাকডেট দেখিয়ে ২০২২ সালে নিয়োগ দেখানো হয়েছে। শুধু ব্যাকডেট দেখিয়ে নিয়োগই নয়, পরবর্তীতে এমপিওভুক্তও করা হয়। তবে তারা বিদ্যালয়ে যোগদান করেন ২০২৬ সালে। এমপিওভুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদান করেন তারা।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বাক্ষর জালিয়াতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যবস্থাপনা কমিটি না থাকার পরিস্থিতিতে কীভাবে এসব নিয়োগ সম্পন্ন হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, প্রধান শিক্ষকের কাছে একাধিকবার বিষয়টি জানতে চাওয়া হলেও তিনি তাঁদের অভিযোগে গুরুত্ব দেননি।

জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. নাঈম বলেন, ‘২০২২ সালে আমার নিয়োগ হয়েছে। কোনো আর্থিক লেনদেন বা ব্যাকডেট দেখানো হয়নি।’ ২০২২ সালে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হান্নান বলছেন, তার সময়ে কোনো নিয়োগ হয়নি। তাহলে আপনি কীভাবে ২০২২ সালে নিয়োগ পেলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলতে পারবেন।’

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ

টাকার বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়া অফিস সহায়ক মো. জুবায়েরের কাছে নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার নিয়োগ কীভাবে হয়েছে, সেটি প্রধান শিক্ষক ভালো বলতে পারবেন। তিনি নিয়োগ দিয়েছেন বলেই আমি নিয়োগ পেয়েছি।’

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মো. আবদুল হান্নান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়িত্ব ছেড়েছি। আমি দায়িত্ব পালনকালে এই চারজনের নিয়োগ হয়নি। কীভাবে আমার স্বাক্ষর দিয়ে তারা নিয়োগ পেলন সে বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি।’

শিক্ষকদের হাজিরা খাতা উধাও করার অভিযোগ
শুধু নিয়োগ নয়, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নথিপত্র গায়েব করারও অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আলমগীরের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শিক্ষকদের হাজিরা খাতা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক বিষয়টি ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের জানিয়েছেন। হাজিরা খাতা গায়েব করার ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খাতায় স্বাক্ষর করতে পারছেন না।

 

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে উত্তর চরভূতা রহিমপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আলমগীরের ব্যবহৃত মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে একজন নারী জানান, তিনি নামাজ পড়তে গেছেন। আসলে কল দেবেন।

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ

কিছুক্ষণ পর মহিউদ্দিন আলমগীরের ছেলে পরিচয় দিয়ে মেহেদী নামে এক ব্যক্তি প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তারা বাবার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো জানতে চান। এ ছাড়া মাউশির তদন্তের চিঠি এবং দুদকে জমা হওয়া অভিযোগগুলো হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন। ডকুমেন্টস পাঠানো হলে মেহেদী বলেন, ‘বাবা আসলে আপনাকে কল দিতে বলব।’

১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন চেয়েছে মাউশি
প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আলমগীরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সর্জেমিনে তদন্ত করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। সে অনুযায়ী ভোলার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ভোলা জেলা শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এ, কে, এম ছালেহ্ উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘তদন্তের চিঠি এখনো পাইনি। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাস নিয়েও ব্যস্ত থাকতে হয়। এজন্য হয়তো খেয়াল করিনি।’ পরে তিনি এ প্রতিবেদনের কাছে তদন্তের চিঠি নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *