মেয়ের হাত ধরে নতুন জীবনের পথে অনিক

বাবার হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে খুঁটির সঙ্গে। চারপাশে মানুষের ভিড়। চুরির অভিযোগে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। সেই ভিড়ের মধ্যেই বাবার কাছে ছুটে আসে ৯ বছরের তুবা। কিছুক্ষণ পর চা ও রুটি নিয়ে ফিরে এসে বাঁধা অবস্থায় বাবার মুখে খাবার তুলে দেয় সে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই দৃশ্যই এখন আলোচনায়।

ভিডিওর ওই ব্যক্তি রায়হানুল হক অনিক শিকদার। তিনি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার বাসিন্দা। ভিডিওতে ঘটনার আগে বা পরে কী ঘটেছিল, তা দেখা যায় না। তাকে কেন বেঁধে রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে পরিবারের বক্তব্যের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়টিও আলাদা।

অনিকের স্বজনরা জানান, অনিকের বাবা অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে পরিবারের অনেক সম্পদ ব্যয় হয়। এতে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়ে। এরপর অনিক মাদকে জড়িয়ে পড়েন। মাদকের জন্য বিভিন্ন জনের কাছে টাকা ধার নেন। কিন্তু সংসারের অভাব-অনটনের জন্য সেই টাকা ফেরত দিতে না পারায় স্থানীয় কয়েকজন মিলে তাকে বেঁধে রাখেন। তিনি চুরি করেননি।

অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফিরদাউস বলেন, ‘সে কোনো দিন চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল না। পূর্বশত্রুতার জের ধরে কয়েকজন তাকে জোর করে বেঁধে রেখে মারধর করে চোর বানাতে চেয়েছিল।’

বামরাইলের বাসিন্দা ও প্রবাসফেরত ওমর খসরু তুহিন বলেন, ‘নেশার কারণে অনিকের জীবন ও পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আমি অনিককে শিক্ষিত ও মার্জিত স্বভাবের মানুষ বলে জানি। নেশায় ডুবে থাকলেও কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে– এমন দেখা যায়নি।’

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। কেউ পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, আবার কেউ অনিকের কর্মসংস্থান ও তুবার পড়াশোনায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

পরিবারটির খোঁজ নেয় ‘উই আর বাংলাদেশ’ (ওয়াব) ফাউন্ডেশনের একটি দল। উজিরপুর থানা পুলিশের সহযোগিতায় গতকাল রবিবার দুপুরে ওয়াব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আকবর রীনকি অনিকের বাড়িতে যান। তিনি বলেন, ‘অনিককে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে তারা উদ্যোগ নিয়েছেন। কর্মসংস্থানের জন্য তাকে একটি অটোরিকশা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তুবার পড়াশোনার দায়িত্বও নেওয়া হয়েছে।’

এদিকে গতকাল দুপুরে উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে বরিশাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল অনিকের বাড়িতে যায়। পরে তাকে মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘অনিক সুস্থ হয়ে ওঠার পর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

এর আগে, রবিবার বিকেলে অনিকের বাড়িতে যান উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘অনিক খারাপ অভ্যাস পরিবর্তন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। তুবার লেখাপড়ার দায়িত্বও নিয়েছি।’

অনিকও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমি ভালোভাবে বাঁচতে চাই। আমাকে আয়-রোজগারের একটা সুযোগ দেওয়া হলে নিজেকে বদলে ফেলব। দুই মুঠো ভাত খেয়ে হলেও সন্তানদের মানুষ করতে চাই।’

অনিক ও জান্নাতুলের দুই সন্তান- নয় বছরের তুবা এবং তিন বছরের তুরিন ইসলাম তুনা। জান্নাতুল এইচএসসি পাস করেছেন। সংসারে নিয়মিত আয় না থাকায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। নিজেও কাজ করতে চান বলে জানিয়েছেন।

জাতীয় শিশু সংগঠন খেলাঘর আসরের বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি পঙ্কজ রায় চৌধুরী বলেন, ‘এই পরিবারের এখন সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সম্ভাবনা এসেছে। অনিকের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া তুবার পড়াশোনায় সহায়তার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তার শিক্ষাজীবনও এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *