১১ সদস্যের পরিবারে পাঁচজনই প্রতিবন্ধী, অসুস্থ বুদ্ধিশ্বরের কাঁধেই সংসারের বোঝা

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দী উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের বন্যাতৈল গ্রামের প্রয়াত গোপাল চৌধুরীর বাড়িতে বসবাস করেন ১১ সদস্যের একটি পরিবার। তাদের মধ্যে পাঁচজন প্রতিবন্ধী। পরিবারের আরেক সদস্য ভুগছেন জটিল চর্মরোগে। জরাজীর্ণ বসতঘর, সীমিত আয় ও চিকিৎসার অভাবে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পরিবারটির সদস্যদের। এত বড় পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা জামাতা বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল।
বন্যাতৈল বাজারের পাশে অবস্থিত বাড়িটিতে রয়েছে একটি পুরোনো ও জরাজীর্ণ টিনের ঘর। ঘরটি বসবাসের প্রায় অনুপযোগী। এর পাশেই রয়েছে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া একটি আধা পাকা ঘর। পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি হওয়ায় ছোট ওই ঘরেই গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে সবাইকে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে মারা যান পরিবারের কর্তা গোপাল চৌধুরী। এর দুই বছর পর মারা যান তার স্ত্রী সরস্বতী চৌধুরী। তাদের বড় ছেলে কাশিনাথ চৌধুরীর (৬৫) দৃষ্টিশক্তি নেই। দুই মেয়ের মধ্যে সুহাগী চৌধুরী (৬২) শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং দ্রৌপদী চৌধুরী (৫৮) বাক্‌প্রতিবন্ধী।
মৃত্যুর আগে ছোট মেয়ে দ্রৌপদীকে একই ইউনিয়নের বাসিন্দা বুদ্ধিশ্বর মণ্ডলের (৬৫) সঙ্গে বিয়ে দেন গোপাল চৌধুরী। বুদ্ধিশ্বর নিজেও জটিল চর্মরোগে আক্রান্ত। তাদের মেয়ে উত্তরা মণ্ডলের (২৮) দুই পা বিকলাঙ্গ।
অন্যদিকে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কাশিনাথ চৌধুরীর স্ত্রী সাধনা চৌধুরী (৬০) বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতার শিকার বলে জানিয়েছে পরিবার। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। সন্তানদের সবার বিয়ে হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে গোপাল চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের ঘরের ভেতরে মেঝেতে বসে ভাত খাচ্ছেন কাশিনাথ চৌধুরী। তার স্ত্রী সাধনা চৌধুরী নাতনিকে কোলে নিয়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনের খোঁজখবরও নিচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে, বারান্দায় বসে ছিলেন বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল।
সাংবাদিকের উপস্থিতির কথা শুনে এগিয়ে আসেন বুদ্ধিশ্বর। তার সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন মেয়ে উত্তরা মণ্ডল। দুই পা বিকলাঙ্গ হওয়ায় তাকে হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল করতে হয়। একইভাবে হামাগুড়ি দিয়ে সামনে আসেন পরিবারের বড় মেয়ে সুহাগী চৌধুরীও।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের দেখভাল ও সংসারের ব্যয়ভার বহনের প্রধান দায়িত্ব বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল এবং কাশিনাথ চৌধুরীর ছেলে বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ওপর। বিশ্বজিৎ দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। তার স্ত্রীর নাম রিতু চৌধুরী।
অন্যদিকে, বুদ্ধিশ্বর স্থানীয় বাজারে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে সামান্য যে অর্থ পান, তা দিয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। সীমিত আয়ে পরিবারের সদস্যদের খাবার, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই পরিবারের সঙ্গে রয়েছেন। তার শ্বশুর গোপাল চৌধুরী বাজারে পান বিক্রি করতেন। সেই সামান্য আয়েই কোনো রকমে সংসার চলত। শ্বশুরের মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্বের বড় একটি অংশ তার কাঁধে এসে পড়ে।
তিনি বলেন, “শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও সপ্তাহে তিন দিন বাজার পরিষ্কারের কাজ করি। এ কাজ করে দোকানিদের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পাই। পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতাও নিতে হয়। এভাবেই পরিবারের সদস্যদের খাবার, পোশাকসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *