বাগেরহাটে পড়া ছেড়ে কাজে ঢুকছে শিশুরা

সোলায়মান কাজীর বয়স ১১ বছর। গত বুধবার সকালে বাবার সঙ্গে আড়তে এসেছিল মাছ কিনতে। তবে শখের বশে নয়, জীবিকার তাগিদে। কারণ আড়ত থেকে কেনা মাছ বিক্রি করতে হবে স্থানীয় হাটে। কোনোদিন মাছ বিক্রি করে, কোনোদিন আবার কারখানায় কাজ করে কাটে তার দিন। অবশ্য বছর দুয়েক আগেও নিয়মিত স্কুলে যেত সে। পড়ত সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে।

বাগেরহাট সদর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে সোলায়মানের বাড়ি। বাবা সাইফুল কাজীর মাছের ছোট ব্যবসা। মা বাসা-বাড়িতে কাজ করেন।

যে বয়সে স্কুলে থাকার কথা, সে বয়সে পড়াশোনা বন্ধ কেন? সে প্রশ্ন ছিল শিশুটির বাবার কাছে।

সাইফুল কাজী বলেন, সংসারে টানাটানি। তাই আমার সঙ্গে কাজ করে, মাঝেমাঝে কারখানায় কাজ শিখে। কিছু তো একটা করে খেতে হবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৯টি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, শিশু কল্যাণ বিদ্যালয়সহ সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৮৪ জন। চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ১০২ জনে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থী কমেছে ১৩ হাজার ৮৮২ জন, যা ২০২৪ সালের সংখ্যার তুলনায় ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম।

এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাসরীন আকতার বলেন, স্কুলে ভর্তির বয়সী শিশুর সংখ্যা কমে আসছে। কিছু শিক্ষার্থী স্কুলে না এসে শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা যাতে শিশু শ্রমে জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। আমরা মা সমাবেশের মাধ্যমে মায়েদের সচেতন ও উৎসাহিত করছি, যাতে বাচ্চাদের কাজে না দিয়ে বিদ্যালয়ে পাঠান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমার চিত্র আরও ভয়াবহ। শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়া, মেয়েদের বাল্যবিবাহ, শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ, শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি ও মাদকাসক্ত হওয়া, কিশোর গ্যাং ও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।

বাগেরহাট সদর উপজেলার রণবিজয়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুর্শিদা আক্তার রূপা বলে, এ বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৫০ জনের মতো ভর্তি হয়েছে। আমাদের সময় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৭০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। প্রতি বছর শিক্ষার্থী কমছে। লামিয়া, সুমাইয়া, সামিয়া নামের তিন বান্ধবী ছিল। পরিবারের চাপে অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়। ওরা লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, বাগেরহাটে সরকারি-বেসরকারি ৩৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২৬ সালে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ৭৯ হাজার ৪৮২ জন। আগের বছরগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত ছিল, সে তথ্য জেলা অফিস দিতে পারেনি। এ অবস্থায় জেলার ১৫টি স্কুলের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৩১ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী জেলায় ৪৭.৫ শতাংশ বাল্যবিয়ে হয়। এর মধ্যে ১৫ বছরের নিচে রয়েছে ১০.২ শতাংশ। ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে বিয়ে হয় ৩৭.৩ শতাংশ মেয়ের।

বাগেরহাট সদর উপজেলার রণবিজয়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ হুমায়ুন কবির বলেন, গত কয়েক বছর ধরে প্রাথমিকের শিক্ষার্থী কমে গেছে। ফলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি কম হচ্ছে। যারাই ভর্তি হচ্ছে, তারাও শেষ পর্যন্ত পড়া চালিয়ে যেতে পারছে না। দারিদ্র্যের কারণে অভিভাবকরা ছেলেদের কাজে পাঠাচ্ছেন, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। যার কারণে শিক্ষার্থী আরও কমছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, পড়াশোনা করে চাকরি হবে না।

সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাসুদেব বিশ্বাস বলেন, শিশুশ্রম, শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ, দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী স্কুলমুখী হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থী কমছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী কমলে মাধ্যমিকে আরও বেশি প্রভাব পড়বে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বাগেরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এস কে এ হাসিব বলেন, অল্প বয়সে বিয়ের পর অধিকাংশ মেয়েই পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছে। শুধু শিক্ষাজীবনই নয়, বাল্যবিবাহের কারণে তাদের শারীরিক ও মানসিক নানা জটিলতার মধ্যেও পড়তে হচ্ছে।

বাগেরহাট জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলাম বলেন, গত ১০ বছরে জেলায় শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় পরিবর্তন হয়েছে। আর্থসামাজিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় স্কুলবিমুখ হচ্ছে বাগেরহাটের প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ, মোবাইল আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলবিমুখ হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *