সম্পত্তি ভাগের পর মায়ের ঠাঁই হলো জরাজীর্ণ ঘরে, পায়ে শিকল

ঝকঝকে টাইলসে মোড়ানো ছেলের ভবন। আর তার পাশেই ঝোপঝাড়ে ঘেরা জরাজীর্ণ টিনের ঘর।

সেই ঘরের বারান্দায় প্রায় এক বছর ধরে পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় দিন কাটছে ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছার।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার রাজগাতি ইউনিয়নের উলুহাটি মাইজপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী মেহেরুন্নেছা ওই গ্রামের মৃত আব্দুস সামেদ ভুইয়ার স্ত্রী।

রবিবার (৯ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝোপঝাড়ে ঘেরা একটি ছোট টিনের ঘরের বারান্দায় মেঝেতে পড়ে আছেন তিনি।

শরীরে ছিল একটি ময়লাযুক্ত কাপড়। তাঁর ডান পায়ে মোটা শিকল বাঁধা। শিকলের অন্য প্রান্ত ঘরের ভেতরের একটি খুঁটির সঙ্গে আটকানো।
মেহেরুন্নেছাকে শিকলে বেঁধে রাখার বিষয়ে তাঁর পুত্রবধূ গেনেদা বেগম বলেন, শাশুড়ি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন।

তাঁর প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ নেই। বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁর স্বামী শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেছেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বামী মারা যাওয়ার পর মেহেরুন্নেছা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ সৃষ্টি হয়। বয়সের ভারে তিনি আগে থেকেই ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারতেন না।

লাঠিতে ভর দিয়ে দু-এক কদম হাঁটতে পারতেন বলে জানায় স্থানীয়রা।
সরেজমিনে বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এ সময় তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে পুত্রবধূ গেনেদা বেগম দ্রুত তাঁর কাছে গিয়ে মুখ চেপে ধরেন এবং মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আব্দুস সামেদ ভুইয়ার তিন ছেলের মধ্যে দুজন পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ বুঝে নিয়ে তা বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন। বড় ছেলে ইকবাল হোসেন ঢাকায় ব্যবসা করেন। তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতেই বসবাস করছেন।

সম্পত্তি ভাগের পর মেহেরুন্নেছার থাকার জায়গা হয় বাড়ির সামনের ওই টিনের ঘরে। বিষয়টি নিয়ে ইকবাল হোসেনের বক্তব্য জানতে তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী জানান, ইকবাল পাশের একটি বাজারে গেছেন। পরে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, বৃদ্ধার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা উচিত এবং তাঁকে এভাবে বেঁধে রাখার বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, ‘বিষয়টি খুবই দুঃখজনক ও অমানবিক। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *