আজ শ্যামাপূজা ও দীপাবলি, যশোরের শ্রীধর পুকুরপাড়ে পাঁচ দিনের আয়োজন

ভূত চতুর্দশীর ঐতিহ্যবাহী আচার পালনের পর আজ রবিবার (৮ নভেম্বর) সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উদ্‌যাপিত হচ্ছে। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিতে দেবী কালীর আরাধনা, প্রদীপ প্রজ্বালন ও ধর্মীয় নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উৎসবটি পালিত হবে। এ উপলক্ষে যশোরের বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। দুই দিনব্যাপী প্রধান ধর্মীয় আচারকে কেন্দ্র করে যশোর শহরের বেজপাড়া শ্রীধর পুকুরপাড়ে আয়োজন করা হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী শ্যামাপূজা উৎসব।

শনিবার (৭ নভেম্বর) ছিল ভূত চতুর্দশী। বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় লোকাচার অনুযায়ী এদিন সন্ধ্যায় ঘরের প্রবেশপথ, উঠান, তুলসীতলা ও বিভিন্ন স্থানে চৌদ্দটি প্রদীপ প্রজ্বালনের রীতি রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাসে এই প্রদীপ প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং অশুভ শক্তি দূর করার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে অঞ্চল ও পারিবারিক প্রথাভেদে এই আচারের ব্যাখ্যা ও পালনের ধরনে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

ভূত চতুর্দশীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য হলো চৌদ্দ ধরনের শাক খাওয়া। বাঙালি হিন্দু সমাজের এই প্রাচীন লোকাচারের সঙ্গে ঋতু পরিবর্তন, কৃষিনির্ভর জীবনধারা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সাংস্কৃতিক যোগসূত্র রয়েছে। পঞ্জিকা ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী কেউ চতুর্দশীর দিন, আবার কেউ তিথি অব্যাহত থাকা অবস্থায় পরদিন সকালে চৌদ্দ শাক গ্রহণ করেন।

ধর্মীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী, আজ রবিবার কার্তিকের অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠিত হবে শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা। হিন্দুধর্মের শাক্ত উপাসনাধারায় দেবী কালীকে আদ্যাশক্তির রূপ হিসেবে আরাধনা করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী কালী অশুভ শক্তির বিনাশ, অজ্ঞানতা ও ভয় দূর করা এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রতীক। বিশ্বশান্তি, পরিবার ও সমাজের মঙ্গল এবং মানবকল্যাণ কামনায় ভক্তরা দেবীর চরণে প্রার্থনা নিবেদন করেন।

প্রচলিত পূজাবিধি অনুযায়ী, অমাবস্যার নিশীথকালে দেবী কালীর বিশেষ আরাধনা অনুষ্ঠিত হয়। মন্দির ও পূজামণ্ডপে পূজার্চনা, মন্ত্রপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি, ভোগ নিবেদন ও আরতির আয়োজন থাকে। তবে পূজার আচার ও আনুষ্ঠানিকতায় স্থানীয় প্রথা এবং উপাসনাপদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্নতা দেখা যায়।

এদিকে শ্যামাপূজাকে কেন্দ্র করে যশোর শহরের বেজপাড়া শ্রীধর পুকুরপাড়ে এবার পাঁচ দিনব্যাপী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় পূজা কমিটির উদ্যোগে মিয়ানমারের বিখ্যাত ‘সুই তাও মিয়াত প্যাগোডা’র আদলে প্রায় ৬০ ফুট উঁচু একটি দৃষ্টিনন্দন পূজামণ্ডপ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় আয়োজকদের তত্ত্বাবধানে ৮ নভেম্বর থেকে এই উৎসব শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পূজা-অর্চনার পাশাপাশি আলোকসজ্জা ও অন্যান্য উৎসব আয়োজনকে ঘিরে এলাকাটিতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

যশোর শহরের রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশন, নীলগঞ্জ মহাশ্মশান মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, বেজপাড়াসহ বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপেও শ্যামাপূজার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

শ্যামাপূজার পাশাপাশি দীপাবলিও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্কৃত ‘দীপাবলি’ শব্দের অর্থ প্রদীপের সারি। আলো দিয়ে অন্ধকার দূর করার প্রতীকী ভাবনা থেকে এ উৎসবে ঘরবাড়ি, মন্দির ও ধর্মীয় স্থানে প্রদীপ, মোমবাতি ও আলোকসজ্জার আয়োজন করা হয়। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলে দীপাবলির সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় আচার যুক্ত রয়েছে। বাংলার শাক্ত ঐতিহ্যে এ সময় শ্যামাপূজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক লোকাচারের সমন্বয়ে ভূত চতুর্দশী, শ্যামাপূজা ও দীপাবলি বাঙালি হিন্দু সমাজের গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে চলা, অশুভের পরিবর্তে শুভবোধ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের কল্যাণ কামনার মধ্য দিয়ে উৎসবগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যশোরেও এসব আয়োজনকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসবের আবহ বিরাজ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *