প্রতিনিধি:স্বরুপ বিশ্বাস যশোর।
নড়াইল শহরের ঐতিহ্যবাহী নিশিনাথতলায় বৈশাখ মাসজুড়ে চলছে পূজা-অর্চনা, মানত ও ধর্মীয় আচার। চিত্রা নদীতে স্নান শেষে শত শত ভক্ত ভেজা কাপড়ে পায়ে হেঁটে এসে পাকুড়গাছের গোড়ায় জল ও দুধ ঢালছেন। কেউ গাছের ডালে বাঁধছেন ইটের টুকরো, কেউ বা উপবাস থেকে প্রার্থনা করছেন রোগমুক্তি ও মনোবাসনা পূরণের আশায়।
নড়াইল শহরের নিশিনাথতলা মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত প্রাচীন পাকুড়গাছকে ঘিরে প্রতি বছর বৈশাখ মাসে এই পূজা-অর্চনার আয়োজন হয়ে থাকে। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং শতবর্ষের এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভক্তদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। বৈশাখ মাসজুড়ে চলবে এ উৎসব।
সম্প্রতি খুব ভোরে দেখা যায়, চিত্রা নদীর বাঁধাঘাটে স্নান সেরে ফুল, ফল, তেল, সিঁদুর ও পবিত্র জল নিয়ে পাকুড়গাছের তলায় ভিড় করছেন নারী-পুরুষ। তারা গাছের গোড়ায় দুধ ও জল ঢেলে প্রার্থনা করছেন। গাছতলা ভরে উঠছে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিতে।
ভক্ত ইলা রানী বিশ্বাস বলেন, “প্রতিবছর এখানে পূজা দিতে আসি। নদীতে স্নান করে জল, ফুল, ফল নিয়ে এসে গাছে জল দেই। বিশ্বাস করি, এতে পূণ্য লাভ হয় এবং মনোবাসনা পূরণ হয়।”
কলেজছাত্র শিমুল পাঠক বলেন, “ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে আসতাম। তখন মাসব্যাপী বড় মেলা বসতো। সার্কাস, যাত্রা, পুতুল নাচ ও মহানাম সংকীর্তনের আয়োজন হতো। এখন আগের মতো মেলা না হলেও, জল ও দুধ ঢালার ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে।”
দুর্ধর্ষ ডাকাত থেকে ‘নিশিনাথ বাবা’
স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, বহু বছর আগে বর্তমান নিশিনাথতলা এলাকাটি ছিল ঘন জঙ্গল। সেখানে আস্তানা গেড়েছিলেন দুর্ধর্ষ ডাকাত সরদার নিশিনাথ। পাকুড়গাছের নিচেই ছিল তার ডেরা।
একদিন এক বৃদ্ধা ওই পথ দিয়ে মেয়ের বাড়ি যাচ্ছিলেন। পথে ডাকাত নিশিনাথের কথা মনে পড়ে ভয় পেয়ে তিনি মনে মনে মানত করেন— নিরাপদে পৌঁছাতে পারলে নিশিনাথের নামে পূজা দেবেন। পরে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন।
এই ঘটনা জানতে পেরে নিশিনাথের মনে পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে তিনি ডাকাতি ছেড়ে ধর্ম সাধনায় মনোনিবেশ করেন। প্রতিদিন ভোরে স্নান শেষে পাকুড়গাছের নিচে সাধনায় বসতেন। একসময় তিনি সিদ্ধিলাভ করেন বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। পরবর্তীতে ওই স্থানেই তার দেহত্যাগ হয়।
পরে স্থানীয়রা সেখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন, যা বর্তমানে ‘শ্রীশ্রী নিশিনাথতলা মন্দির’ নামে পরিচিত।
নিশিনাথতলা মন্দির পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক দাস বুড়ো জানান, এ বছরও বৈশাখজুড়ে মহানাম সংকীর্তনের আয়োজন করা হয়েছে। মাসের শেষ সপ্তাহে মেলা আরও জমজমাট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্দিরের পূজারী সুনীল চক্রবর্তী বলেন, “ঠিক কত বছর ধরে এখানে পূজা হচ্ছে তা জানা নেই। তবে এটি অন্তত ৩০০ বছরের পুরনো ধর্মীয় স্থান বলে শোনা যায়। ভক্তদের বিশ্বাস, নিশিনাথবাবার কাছে কেউ খালি হাতে ফেরেন না।”
