দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ সরকারের জন্য অস্বস্তি তৈরি করেছে। গতকাল সোমবার তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং তা গৃহীত হয়। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে সরকার ও দলের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর বলছে, স্থানীয় রাজনীতি, সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং নিজ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কাজের সমন্বয় হচ্ছিল না।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান উল্লেখ করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বাড়াতে তিনি পদ থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন।
পদত্যাগ বিষয়ে জানতে গতকাল রাত ১০টার দিকে দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সমকাল। তবে তিনি ফোন ধরেননি।
জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ঈদের আগে তাঁর (দীপেন দেওয়ান) সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তিনি কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। অনেক সভায় অংশ নিতে পারতেন না। আমাকে সভাগুলো চালিয়ে নিতে বলেছেন। আজ (গতকাল) আমি যখন ভূমি মন্ত্রণালয়ে ছিলাম তখন টিভির খবরে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি জানতে পারি।’
উল্লেখ্য, মীর হেলাল উদ্দিন চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য।
রাঙামাটিতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ
পার্বত্যমন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ানকে পুনর্বহালের দাবিতে গতকাল বিকেলে প্রায় এক ঘণ্টা শহরের কাঁঠালতলীতে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ সময় সড়কের উভয় দিকে যানজট সৃষ্টি হয়। অবরোধকালে নেতাকর্মীরা পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভুট্টো, সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম পনির, ছাবের আহম্মদ, মুজিবুর রহমান, মানস মুকুল চাকমা, নূরজাহান বেগম, পারুল বেগম, ইয়াছমিন বাবলী প্রমুখ।
কেউ কথা বলেননি
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে সরকারের কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা গতকাল গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলেননি। সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বললেও তারা কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে সাড়ে তিন মাসের মাথায় এ পদত্যাগ সরকারের জন্য যে অস্বস্তিকর– কেউ কেউ স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চলের মন্ত্রী হওয়ায় এ বিষয় কিছুটা সংবেদনশীলতাও তৈরি করেছে।
মন্ত্রীর অস্বস্তি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা ছিল
৬৩ বছর বয়সী দীপেন দেওয়ান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য রাঙামাটি আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সর্বাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রী হন তিনি।
রাঙামাটি বিএনপির নেতারা জানান, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়টি আগে থেকে তারা আঁচ করতে পারেননি। তাদের ধারণা, মন্ত্রণালয় পরিচালনা, রাঙামাটির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে মতবিরোধের জেরে দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করতে পারেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে বিভক্তি থাকলেও তা চাপা ছিল। এখন সে বিরোধ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এক পক্ষে আছেন দীপেন দেওয়ানের অনুসারী, অন্য পক্ষে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারের অনুসারীরা।
তবে জেলা বিএনপির নেতারা এমন বিরোধের বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন এবং এর সঙ্গে পদত্যাগের সম্পর্ক নেই বলে মত ব্যক্ত করেছেন। তবে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং এ নিয়ে সৃষ্ট বিভিন্ন চাপের সঙ্গে তাঁর পদত্যাগের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই দশক ধরে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন দীপেন দেওয়ান। তিনি ভদ্র, সদালাপী, বিনয়ী ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
দীপেন দেওয়ানের এক ঘনিষ্ঠ অনুসারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীপেন পূর্ণ মন্ত্রী হলেও মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে ছিল না। এতে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। একইভাবে এলাকার রাজনীতিতেও তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়ছিলেন।
গত ১৫ এপ্রিল রাঙামাটি শহরের তবলছড়ির মাঝের বস্তিতে পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটির উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে দীপেন দেওয়ান প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। তবে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল মঞ্চে আসার আগে তিনি অনুষ্ঠানস্থান ত্যাগ করেন। এর আগে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা থাকলেও এ ঘটনার পর দুইজনের মধ্যে সম্পর্কের শীতলতার বিষয়টি সামনে আসে।
পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে মতভেদ
দীপেন দেওয়ানের অনুসারী ও বিএনপির একজন জেলা নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন ঘিরে মন্ত্রীর প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক বাড়ছিল। ফলে সরকার গঠনের সাড়ে তিন মাস পার হলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করা যায়নি। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে তুলনামূলক জটিলতা কম থাকলেও রাঙামাটি জেলা পরিষদ, শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্স এবং পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ড পুনর্গঠন নিয়ে নানা মতভেদের কথা শোনা যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যান। পরিষদগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তিন মাস পর ওই বছরের ৭ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করে। পার্বত্য জেলা পরিষদের অন্তর্বর্তীকালীন আইনের বিধান অনুযায়ী, পাহাড়ের ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব জাতিসত্তা ও জনগোষ্ঠীর সুষম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে পরিষদ গঠন করা বাধ্যতামূলক। তবে আগের পুনর্গঠনে কোনো কোনো সম্প্রদায় বাদ পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে উদ্ভূত নানামুখী সংকট পাহাড়ের প্রশাসনিক কাঠামোকেও স্থবির করে তোলে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হতে চেয়েছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার। দীপেন দেওয়ান এতে রাজি ছিলেন না। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সাবেক সিবিএ নেতা সুভাষ চাকমা, বিএনপির কেন্দ্রীয় উপজাতীয়-বিষয়ক সম্পাদক কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ান ও জিয়া পরিষদের জেলা কমিটির সভাপতি মানস মুকুর চাকমার মধ্যে যে কোনো একজনকে চেয়ারম্যান পদটি দিতে চেয়েছিলেন।
এই প্রক্রিয়ায় সমতলের মন্ত্রী-এমপির হস্তক্ষেপের কথাও আলোচনায় আসে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নিজের পরিকল্পনা বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধার মুখে পড়ায় তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে অনেকে মনে করছেন।
দলীয় কমিটি গঠন নিয়েও অসন্তোষ
সম্প্রতি রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে দীপেন দেওয়ানের পছন্দকে আমলেই নেওয়া হয়নি। কমিটি গঠন নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের আচরণ নিয়েও তাঁর মধ্যে অসন্তোষ ছিল।
স্থানীয় বিএনপির এক নেতা জানান, দলের সব পর্যায়ে দীপেন দেওয়ানের প্রতিপক্ষকে উস্কে দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়ে তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করতেন। এসব বিষয় সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানাতে গিয়েও জানাতে পারেননি তিনি।
জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার বলেন, ‘পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তিনি তাঁর পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। তাঁর পদত্যাগ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জানি না। তবে আমাদের দলে কোনো কোন্দল নেই। আমরা সব সময় দীপেন দেওয়ান এমপি ও মন্ত্রীকে সম্মান করেছি।’
যেভাবে রাজনীতিতে
শিক্ষাজীবন শেষে দীপেন দেওয়ান জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন। ২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের পদ ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন বিএনপিতে। ২০১০ সালে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতিগতভাবে চাকমা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। দীপেন দেওয়ানের বাবা সুবিমল দেওয়ান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতি-বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
