‘বাবার দুই হাত চেপে ধরেন দুজন, আরেকজন বুকে গুলি করেন’

‘বাবা ডাব খাচ্ছিলেন। এ সময় তিনজন এসে লাথি মেরে তাঁর হাত থেকে ডাব ফেলে দেন। এরপর তাঁকে মাটিতে শুইয়ে দুই হাত চেপে ধরেন দুজন। পরে তাঁরা বাবার বুকের ওপর থেকে শার্ট ছিঁড়ে ফেলেন। পরে আরেকজন বাবার বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেন।’

কথাগুলো বলছিলেন খোরশেদ আলমের (৪৫) মেয়ে প্রেমা আক্তার (১৯)। গতকাল বুধবার বেলা দেড়টার দিকে বাড়ির পাশেই খোরশেদ আলম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরিবারের অভিযোগ, ইটভাটায় মাটি বিক্রির ব্যবসায় নিয়ে বিরোধ থেকে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

খোরশেদ আলম লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দিলশাদপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে। তিনি ইটভাটায় মাটি বিক্রির ব্যবসা করতেন। তাঁর বিরুদ্ধেও হত্যা, অস্ত্র, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে মুঠোফোনে কথা হয় প্রেমা আক্তারের সঙ্গে। বাবার এই মৃত্যুর ঘটনা তিনি কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না। ঘটনার পর তিনি প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে বর্ণনা শুনেছেন। হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁর বাবার সঙ্গে এক বন্ধুও ছিল। ওই বন্ধু তাঁর বাবার হত্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মেয়ের অভিযোগ, তাঁর বাবাকে গুলি করা ব্যক্তির নাম মো. ওয়ালিদ।

নিহত খোরশেদের স্ত্রী মুক্তা বেগম (আকলিমা আক্তার) গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, খোরশেদ মাটির ব্যবসা করতেন। গতকাল দুপুরে তাঁকে মোরশেদ ও মজিদ নামের দুজন বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। ঘর থেকে বের হয়ে কিছু দূর যাওয়ার পরই গুলির শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখেন স্বামীর বুক রক্তে ভিজে যাচ্ছে। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে হাসপাতালে নিতে নিতে সব শেষ হয়ে যায়।

মুক্তা বেগমের অভিযোগ, ওয়ালিদ নামের ব্যক্তি মাটির ব্যবসা নিয়ে এর আগেও তাঁর স্বামীকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছে।

নিহত খোরশেদের বাড়ি থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় ১৫০ গজ। তাঁর বুকে দুটি গুলি করা হয়েছে। পুলিশ গতকাল ঘটনাস্থল থেকে তিনটি গুলি উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে দুটি খালি খোসা, অন্যটি অব্যবহৃত গুলি।

ঘটনাস্থলের কাছেই গ্রাম পুলিশ নূর মোহাম্মদ চৌধুরীর বাড়ি। তিনি বলেন, সড়কের পাশের একটি বাড়ির ফটকসংলগ্ন স্থানে খোরশেদকে গুলি করা হয়। গুলির শব্দ খুব বেশি হয়নি। তাঁর ধারণা, খোরশেদের বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে যেসব গুলি উদ্ধার করা হয়েছে এগুলো খুব কাছাকাছি স্থানে ছিল।

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা অরূপ পাল বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই খোরশেদের মৃত্যু হয়। তাঁর বুকে দুটি গুলির ক্ষত ছিল। বুকের মাঝখানে একটি ছোট ক্ষত এবং আরেকটি বড় ক্ষত দেখা গেছে।

এদিকে এ ঘটনায় খোরশেদ আলমের স্ত্রী মুক্তা বেগম বাদী হয়ে গতকাল রাতে মামলা করেছেন। মামলায় মো. ওয়ালিদ, মো. সোহাগসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুজনকে আসামি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন সদর উপজেলার দিলশাদপুর গ্রামের ইব্রাহিম ছোট্টু (৪৪) ও একই উপজেলার রাধাপুর গ্রামের তোফায়েল আহমেদের ছেলে মাসুদ রানা (২৬)।

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াহিদ পারভেজ বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল কাজ করছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ, কীভাবে খুন করা হয়েছে সবকিছু নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

এর আগে গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে জাকির হোসেন নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে। গত রোববার দিবাগত রাত একটার দিকে সদর উপজেলার পূর্ব নন্দনপুর গ্রামের একটি সুপারিবাগান থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

‘মাদক কারবার’ নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। নিহত জাকির পূর্ব নন্দনপুর এলাকার তোফায়েল আহমেদের ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকের একাধিক মামলা আছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *