সাদ্দাম হোসেন বদলে দিচ্ছেন সাতক্ষীরার মধুর গল্প

মধুর প্রয়োজন হলেই সবারই যে চিন্তা আসে, মধু ভেজাল না খাঁটি। সেই খাঁটি মধু প্রতিটি বাড়িতে পৌঁছে দিতে কাজ করছেন সাতক্ষীরা সদরের চুপড়িয়া গ্রামের সাদ্দাম হোসেন।

বাসা-বাড়ির ছাদ, মসজিদের কার্নিশে কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে স্থাপন করেন কাঠের ছোট ছোট মৌ বাক্স। সেখান থেকেই প্রাকৃতিক উপায়ে সংগ্রহ হচ্ছে খাঁটি মধু।

বিসিক কর্মকর্তা বলছেন, ক্ষুদে মৌমাছি পালনে, সাতক্ষীরায় বিপ্লব ঘটিয়েছে সাদ্দাম। মৌচাষী সাদ্দাম, গত দশ বছর যাবৎ করছেন মৌচাষ। শুধু নিজেই মধু সংগ্রহ করেন না, উৎসাহ দেন অন্যদেরও। দিনে দিনে বদলে যাচ্ছে সাতক্ষীরার মধুর গল্প।

সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন প্রান্তে দুইশো মৌবাক্স বসিয়েছেন সাদ্দাম হোসেন। বর্তমানে কুলবাগানের আশপাশে থাকা বাসা বাড়ি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠাণে স্থাপন করেছেন এ মৌবাক্স।

মৌচাক সংগ্রহের পর পরিচ্ছন্ন হাতে মধু বোতলজাত করেন সাদ্দাম। বিসিক থেকে অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠাণের নাম দিয়েছেন মৌমাছি কুঠির। সাদ্দামের লক্ষ্য, একটি বাড়ি একটি মৌ বক্স। ভেজালের ভিড়ে প্রতিটি বাড়িতে খাঁটি মধু পৌঁছে দেয়া। পরিবেশে মৌমাছির বিস্তার ঘটানো।

মৌচাষী সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমি দশ বছর ধরে, মৌচাষ করে আসছি। আমি মূলত ক্ষুদে মৌমাছি নিয়ে কাজ করি। যে মৌমাছি গাছের খোড়লে অর্থাৎ গাছের ফাঁকে জন্মে। বর্তমানে আমার দুইশ’ মৌবাক্স রয়েছে। যে বাক্সগুলো জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বাসা-বাড়ি, প্রতিষ্ঠাণ, মসজিদ, কুলবাগানের ধারে বসানো রয়েছে। খাঁটি মধু সংগ্রহের পর বোতলজাত করে বিক্রি করি। বছর এটা থেকে আমার আয় হয় সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা। বর্তমানে দশজন তরুণ আমার নিকট থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। কিভাবে ক্ষুদে মৌমাছি পালন করে লাভবান হওয়ায় যায়। এটি লাভজনক একটি ব্যবসা।

তিনি আরও বলেন, আমার উদ্দেশ্য প্রতিটি বাড়িতে খাঁটি মধু পৌঁছে দেয়া। মানুষ মধু সম্পর্কে জানে না, মানুষকে খাঁটি মধু ও তার উপকারীতা সম্পর্কে জানানো। এখন ভেজাল মধুতে বাজার সয়লাব। খাঁটি মধু মানুষ চিনতে পারে না। কিন্তু সে যদি বাড়িতে একটি মৌবাক্স বসায় সেখান থেকেই বিভিন্ন ফুল থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে সংগ্রহ করা মধু নিজেরাই সংগ্রহ করতে পারে।

ক্ষুদে মৌচাষী সাদ্দাম হোসেন আরও বলেন, আমার থেকে সংগ্রহ করে ৮০ জন ব্যক্তি তাদের বাসা বাড়ি ও প্রতিষ্টাণে মৌবাক্স বসিয়েছেন। এখন তারা নিজেরাই সেখান থেকে মধু সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্যদের খাঁটি মধু খাওয়ান। আমি চাই প্রতিটি বাড়িতে খাঁটি মধু পৌঁছে যাক।

এই চাষীর থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া তরুণরা জানান, এটি খুব লাভজনক একটি ব্যবসা। বেকার তরুণ মৌমাছি পালন করেও স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেজন্য আমরা শিখছি।

নিজ চোঁখে মৌচাক দেখে, মুখে স্বাদ নিয়ে মধু ক্রয় করেন সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেকে। কলারোয়া থানার ওসি মিজানুর রহমান তাদেরই একজন।

ওসি বলেন, আমি কখনো নিজ চোঁখে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করা দেখিনি। খাঁটি মধু খেতেও সুস্বাদু। ভেজাল মুক্ত তাই সাদ্দাম হোসেনের থেকে পরিবারের সদস্যদের জন্য মৌচাকসহ মধু সংগ্রহ করেছি।

সাতক্ষীরা বিসিকের উপ ব্যবস্থাপক গৌরব দাস বলেন, সাদ্দাম কাজ করেন ক্ষুদে মৌমাছি নিয়ে। আমাদের প্রতিষ্ঠাণের ছাদেও তিনি একটি মৌবাক্স দিয়েছেন। তার উদ্যোগে মৌমাছির বিপ্লব ঘটেছে সাতক্ষীরায়। সফল মৌচাষী হিসেবে সাদ্দাম হোসেন অনুকরণীয়।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলবর্তী সাতক্ষীরা পরিবেশ বিপর্যয় ঝুঁকিতে রয়েছে। সেকারণে উপকূলীয় কয়েকটি জেলায় মৌমাছির উপর একটি প্রকল্প আসছে সামনে। যে কয়েকটি জেলায় এ প্রকল্প আসছে তার মধ্যে সাতক্ষীরা একটি। এই প্রকল্পের আওতায় মৌমাছি পালন, উদ্বুদ্ধকরণের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান ও জনসচেতনতা তৈরীতে কাজ করা হবে। মৌমাছি পরিবেশ ভারসম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

সাতক্ষীরা খামার বাড়ির অতিরিক্ত উপ পরিচালক জামালউদ্দীন বলেন, মৌমাছি ফুল ও ফসলের বন্ধু। অনেক সময় সরিষা, কুল চাষীরা না বুঝেই মৌচাষীদের ক্ষতি করে ফেলে। মৌবাক্স নষ্ট করে দেয়। আমাদের উপ সহকারি কৃষি কর্মকর্তারা যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে, চাষীদের যেন মৌমাছির গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করে। বছরে শুধুমাত্র সরিষা ও কুলের ফুল থেকে দুই কোটি টাকার বেশী মধু সংগ্রহ হচ্ছে সাতক্ষীরায়। এতে মৌচাষীরা যেমন লাভবান হচ্ছেন তেমনি কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে, ফসল বৃদ্ধি পাচ্ছে কৃষক লাভবান হচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *