পূজা শেষে বাড়ি ফেরা হলো না বাবা-ছেলের, সড়কে ঝরল দুই প্রাণ

গাজীপুরে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত তপন ও লিখন, স্বামী-সন্তান হারিয়ে শোকে পাথর লক্ষ্মী রানী

গাজীপুরের টঙ্গীতে সড়ক দুর্ঘটনায় তপন চন্দ্র দাস (বাবা) ও তাঁর ছেলে লিখন চন্দ্র দাস নিহত হয়েছেন। পূজা শেষে জামালপুর থেকে টঙ্গীতে ফেরার পথে শনিবার ভোরে গাজীপুরা এলাকায় মহাসড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি ট্রাকের ধাক্কায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন লক্ষ্মী রানী।

স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে লক্ষ্মী রানীর কান্না থামছেই না। বারবার বিলাপ করে তিনি বলছেন, ‘আমি কী নিয়ে বাঁচব রে? কে আমাদের দেখবে? আমার তো এই পৃথিবীতে আর কেউ রইল না রে।’ তাঁর এই আহাজারিতে শোকাহত স্বজনদের চোখেও পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত তপন চন্দ্র দাস ও তাঁর ছেলে লিখন চন্দ্র দাস হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাঁদের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার কৈবর্তপাড়া এলাকায়। তাঁরা গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন গাজীপুরা ২৭ নম্বর চৌরাস্তা এলাকায় বসবাস করতেন।

পরিবারের সদস্য লিখা রানী জানান, পূজা শেষ করে তাঁর বাবা ও ভাই জামালপুর থেকে টঙ্গীতে ফিরছিলেন। শনিবার ভোরে গাজীপুরা এলাকায় পৌঁছে মহাসড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি ট্রাক তাঁদের ধাক্কা দেয়। এতে লিখন চন্দ্র দাস ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত তপন চন্দ্র দাসকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

তপন চন্দ্র দাস মস্কো কটন মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। দীর্ঘ নয় বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্টিং বিভাগে অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। পরিবারের জীবিকা নির্বাহ ও স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাতে নিয়মিত পরিশ্রম করতেন তপন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাকসুদুল আলম জানান, শনিবার ভোর সোয়া চারটার দিকে গাজীপুরা বিআরটি লেনের পূর্ব পাশে কুটুমবাড়ি হোটেলসংলগ্ন মহাসড়কে একটি গাড়ির ধাক্কায় বাবা ও ছেলে গুরুতর আহত হন।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক লিখন চন্দ্র দাসকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত তপন চন্দ্র দাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

ওসি আরও জানান, নিহত বাবা ও ছেলের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নিহত বাবা ও ছেলের মরদেহ জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার কৈবর্তপাড়া গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সেখানেই তাঁদের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হবে।

পূজার আনন্দ শেষে পরিবারের কাছে ফেরার কথা ছিল বাবা-ছেলের। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। তাঁদের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের ঘরে এখন শুধুই শোক আর কান্না। স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে লক্ষ্মী রানীর আর্তনাদ যেন এক মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া একটি পরিবারের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *