যদি জানতাম বাবা হারিয়ে যাবে, পানিতে নামতাম না

‘সাঁতার কাটার সময় আমায় ধাক্কা দিয়ে ঠিকই ওপরে তুলে দিল বাবা। কিন্তু চোখের সামনে বাবা পানিতে তলিয়ে গেল। অসহায় হয়ে দেখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না। পরনের তিনটি ওড়না বেঁধে বাবার দিকে ছুড়ে দিলেও পানির স্রোতের কারণে বাবা ধরতে পারেননি। বাবাকে হারিয়ে ফেললাম আমরা। যদি জানতাম বাবা হারিয়ে যাবে, তাহলে কখনো পানিতে নামতাম না।’

বাবার কথা বলতে বলতে বারবার কাঁদছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সেমন্তী আক্তার। সে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের সরযু বালা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে। গত শুক্রবার জেলার করিমগঞ্জ উপজেলায় হাওরের প্রবল স্রোত থেকে মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান তার বাবা মো. বাছির উদ্দিন (মিলন)।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিঠামইন হাওরে বেড়াতে যান বাছির উদ্দিন। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী, তিন মেয়ে, ছোট বোনসহ অন্তত ১০ জন স্বজন। সকালে কিশোরগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে তাঁরা মিঠামইনের জিরো পয়েন্টে ঘোরাঘুরি করেন। পরে ফেরার পথে বেলা তিনটার দিকে হাসানপুর সেতুসংলগ্ন এলাকায় কয়েকজনকে নিয়ে হাওরের পানিতে নামেন বাছির উদ্দিন। একপর্যায়ে প্রবল স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকে তাঁর মেজ মেয়ে সেমন্তী। মেয়েকে বাঁচাতে দুই-তিনবার ধাক্কা দিয়ে নিরাপদ দিকে তুলে দিলেও নিজে স্রোতে ভেসে যান। প্রায় এক ঘণ্টা পর স্থানীয় মানুষের সহায়তায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আজ রোববার দুপুরে কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল পেট্রলপাম্প-সংলগ্ন এলাকায় বাছির উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনেই তাঁর কবর। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধ বাবা মো. আবু বাক্কার। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। বাছিরের দুই বছর বয়সী ছোট মেয়ে সাইয়ারা আক্তার কবরের পাশে গিয়ে বলে, ‘এখানে আমার বাবা শুয়ে আছে।’ এরপর আবার খেলতে চলে যায়।

নিহত ব্যক্তির বাবা মো. আবু বাক্কার বলেন, বাছির উদ্দিন তাঁর চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। ছেলে ঢাকায় থাকতেন। বেড়াতে যাওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার সকালবেলায় হাওরে বেড়াতে যাওয়ার আগে ছেলে আমায় ফোন করে বলে, “বাবা, হাওরে বেড়াতে যাব, আপনিও কি যাবেন?” এটাই ছেলের সাথে আমার শেষ কথা। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী বস্তু হলো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ—সেটা আমি এখন টের পাচ্ছি।’

শুক্রবারের ঘটনার পর থেকে বাছির উদ্দিনের স্ত্রী শারমিন আক্তার এবং দুই বড় মেয়ে মাহ্জুবা ও সেমন্তী প্রায় খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, মেয়েরা বাবার মৃত্যুর শোক সামলাতে পারছে না। স্বামীকে চোখের সামনে হারিয়ে বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্ত্রীও।

পরিবারের সদস্যরা বলেন, তিন মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি ব্যাংকের ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে, তা নিয়ে তাঁরা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। নিহত বাছিরের একমাত্র বোন শিমুলা আক্তার বলেন, ‘চোখের পলকে আমার ভাই পানিতে তলিয়ে গেল। সকালে ১০ জন হাসিখুশি মনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ভাইয়ের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ভাইয়ের তিন মেয়েসহ ভাবি এখন পাগলপ্রায়। তাঁদের কী বুঝ দিব? আমাদের আবদার, ঋণগ্রস্ত এই ভাইটির পরিবারের প্রতি যেন ব্যাংকসহ সকলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।’

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক। স্ত্রী-সন্তানের সামনে এভাবে পানিতে তলিয়ে গিয়ে মৃত্যু— স্বজনদের মেনে নেওয়া কষ্টকর। তবে তাঁর মৃত্যুতে বুঝা যায়, পিতা-মাতার কাছে সন্তানের মূল্যই সবচেয়ে বেশি। নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও পিতা-মাতা সন্তানকে বাঁচাতে চান। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবো।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *