চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের পদুয়া গ্রামের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী— গুপ্ত জমিদার বাড়ি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, বরং দক্ষিণ চট্টগ্রামের বহু বছরের ইতিহাস, লোককথা ও সংস্কৃতির অংশ।
গুপ্ত জমিদার বাড়ি
প্রায় তিনশ বছর আগে জমিদার রামমোহন গুপ্তের হাত ধরে এই জমিদার বাড়ির যাত্রা শুরু হয়। জানা যায়, গুপ্ত বংশের পূর্বপুরুষরা ময়মনসিংহ থেকে এসে লোহাগাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। তখন এই অঞ্চল আরকান রাজ্যের অধীনে ছিল এবং এলাকায় মং, চাকমাসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় বাঙালিদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে রামমোহন গুপ্ত হিন্দু ও মুসলিম বাঙালিদের নিয়ে একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে একজন প্রিয় ও প্রজাহিতৈষী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে আরেকটি রহস্যময় গল্পও। এক মুসলিম নারীর সঙ্গে রামমোহন গুপ্ত ধর্মভাই-বোনের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বলা হয়, সেই নারী স্বপ্নে গুপ্তধনের সন্ধান পান এবং পরে রামমোহন গুপ্তকে নিয়ে সেই গুপ্তধন উদ্ধার করেন। নিজের কোনো উত্তরাধিকারী না থাকায় তিনি তার সম্পদ ধর্মভাই রামমোহনের হাতে তুলে দেন। সেই সম্পদের মাধ্যমেই শুরু হয় গুপ্ত জমিদারির পথচলা।
রামমোহন গুপ্ত ছিলেন প্রজাহিতৈষী জমিদার। তিনি এলাকায় মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতেন। ধর্মবোনের মৃত্যুর পর তার স্মরণে প্রতি বছর একই রঙের প্রায় আটটি গরু জবাই করে বিশাল মেহমানদারির আয়োজন করতেন বলেও জানা যায়। তবে পরবর্তী জমিদাররা ধীরে ধীরে সেই ঐতিহ্য বন্ধ করে দেন।
প্রায় ১০ একর জমির উপর নির্মিত এই বিশাল জমিদার বাড়িটি একসময় ছিল ১২০ কক্ষ বিশিষ্ট। পশ্চিম পাশে ছিল সুউচ্চ ভবন, দক্ষিণে দ্বিতল ভবন, পূর্ব পাশেও ছিল আরেকটি স্থাপনা। পুরো জমিদার বাড়ি ছিল দুই ভাগে বিভক্ত— একদিকে কাচারি ঘর, যেখানে জমিদার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন; অন্যদিকে ছিল অন্দরমহল। সেখানে মন্দির, পাঠশালা ও নানা সুযোগ-সুবিধা ছিল। বিশাল দেয়াল, বড় বারান্দা আর কারুকার্যময় প্রবেশদ্বার আজও সেই সময়ের স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য বহন করে।
জমিদারদের খনন করা “ঠাকুর দিঘি” নামের ২২.৪৩ একর আয়তনের বিশাল দিঘিটিও এখনো টিকে আছে, যা এই এস্টেটের অন্যতম আকর্ষণ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে জমিদার বাড়ির অনেক অংশ। একসময়ের ১২০ কক্ষের বিশাল প্রাসাদে এখন অবশিষ্ট আছে মাত্র ২০টি কক্ষ। এখনো সেখানে বসবাস করছেন জমিদার বংশের উত্তরসূরীরা। তবে নেই সেই আগের জৌলুস, নেই রাজকীয় ঐশ্বর্য। ইতিহাসের ভার বয়ে নিয়ে আজ তারা অনেকটাই নীরব, সংগ্রামী জীবন কাটাচ্ছেন।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, লোককাহিনি আর হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে পদুয়ার গুপ্ত জমিদার বাড়ি।