বরিশালে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আবেগঘন পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্মশান দীপালি উৎসব। কালীপূজার আগের দিন পবিত্র ভূত চতুর্দশী তিথিতে প্রতিবছরের মতো এবারও বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকার ঐতিহাসিক মহাশ্মশানে আয়োজন করা হয়েছে এ ব্যতিক্রমী ধর্মীয় উৎসবের। প্রয়াত পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় হাজার হাজার মোমবাতি, ধূপকাঠি ও প্রদীপ প্রজ্বালন করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যার আগ থেকেই বরিশাল মহাশ্মশানে ভিড় করতে শুরু করেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও ভক্তরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মোমবাতি ও প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো শ্মশান প্রাঙ্গণ। একদিকে স্বজনদের সমাধিতে প্রদীপ প্রজ্বালন, অন্যদিকে ধূপের সুগন্ধ, প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন ও পবিত্র পরিবেশ।
এদিন অনেকেই তাঁদের প্রয়াত স্বজনদের সমাধি ফুল, মোমবাতি, প্রদীপ এবং পছন্দের খাবারসহ বিভিন্ন উপাচারে সাজিয়ে তোলেন। ধর্মীয় রীতি মেনে প্রার্থনা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করেন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রিয় মানুষগুলোকে। কারও চোখে ছিল হারানো স্বজনের স্মৃতি, কারও মনে ছিল তাঁদের আত্মার চিরশান্তি কামনা। জীবিত ও প্রয়াত মানুষের আত্মিক সম্পর্কের এক অনন্য প্রকাশ হয়ে ওঠে এই শ্মশান দীপালি উৎসব।
উৎসবে অংশ নিতে আসা গোবিন্দ বলেন, এটি শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য। যাঁরা পৃথিবী ছেড়ে পরলোকগমন করেছেন, তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় আমরা এখানে প্রার্থনা করি। প্রতিবছর দীপাবলি উপলক্ষে পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা এখানে আসেন এবং তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালান। উৎসবকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও আমরা সন্তুষ্ট।
বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার মুরালী জানান, ১৮৭৬ সালে বরিশাল পৌরসভা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মহাশ্মশানটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। তবে এর ইতিহাস আরও পুরোনো। নগরীর কাউনিয়া এলাকায় প্রায় ২০০ বছর আগে ৫ একর ৯৬ শতাংশ জমির ওপর এ মহাশ্মশান প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত।
মহাশ্মশানটিতে পুরোনো ও নতুন মিলিয়ে ৬১ হাজারের বেশি সমাধি রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি পাকা এবং প্রায় ১০ হাজার কাঁচা মঠ রয়েছে। পাশাপাশি এমন প্রায় ৯০০টি মঠ রয়েছে, যেগুলোর স্বজনরা বর্তমানে দেশে বসবাস করেন না। এসব স্বজনহীন মঠ হলুদ রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের অনুপস্থিতিতে মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে এসব সমাধিতে মোমবাতি ও প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। ফলে দূরদেশে অবস্থানরত স্বজনদের পূর্বপুরুষের স্মৃতিও যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করা সম্ভব হয়।
ভূত চতুর্দশী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ তিথি। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুসারে এদিন প্রয়াত পূর্বপুরুষ ও স্বজনদের স্মরণে দীপ প্রজ্বালন করা হয়। সেই বিশ্বাস ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করেই বরিশাল মহাশ্মশানে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় শ্মশান দীপালি উৎসবের। হাজার হাজার প্রদীপের আলোয় সমাধিগুলো আলোকিত করে প্রয়াত স্বজনদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভক্তরা।
শুধু বরিশাল নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চল থেকে মানুষ এ উৎসবে অংশ নিতে আসেন। পাশাপাশি ভারত ও নেপাল থেকেও প্রতিবছর শত শত মানুষ তাঁদের প্রয়াত স্বজনদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে বরিশাল মহাশ্মশানে উপস্থিত হন। ফলে এ আয়োজন কেবল স্থানীয় কোনো উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সীমান্ত পেরিয়ে আত্মীয়তার বন্ধন, পারিবারিক স্মৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক বৃহৎ মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
আয়োজকদের দাবি, বরিশালের শ্মশান দীপালি উপমহাদেশের প্রথম ও বৃহত্তম আয়োজনগুলোর অন্যতম। প্রতিবছর হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে এ উৎসবের পরিসর ও পরিচিতি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রয়াত স্বজনদের সমাধিতে একযোগে এত বিপুলসংখ্যক প্রদীপ প্রজ্বালনের দৃশ্য উৎসবটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
এদিকে উৎসবকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন। মহাশ্মশান ও আশপাশের কাউনিয়া এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দর্শনার্থী ও ভক্তদের নির্বিঘ্নে উৎসবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বরিশালের ঐতিহাসিক মহাশ্মশানে শ্মশান দীপালি উৎসব তাই কেবল প্রদীপ প্রজ্বালনের আয়োজন নয়; এটি প্রয়াত স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। হাজারো আলোকশিখার মধ্য দিয়ে জীবিত মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকেন প্রয়াত প্রিয়জনেরা। ধর্মীয় বিশ্বাস, মানবিক আবেগ ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে বরিশালের এই শ্মশান দীপালি উৎসব প্রতিবছরই সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।