পরিচয় নিয়ে সন্দেহ, এসআই ও সোর্সসহ ৩ জনকে ক্যাম্পাসে তুলে নিয়ে এলেন কুবি শিক্ষার্থীরা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) দুই শিক্ষার্থীকে তল্লাশির সময় পুলিশ পরিচয় দেওয়া তিন ব্যক্তিকে ছিনতাইকারী সন্দেহে আটক করে ক্যাম্পাসে নিয়ে এসেছেন শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কুমিল্লা শহরের পুলিশ লাইন ও সরকারি মহিলা কলেজ এলাকার কাছে এ ঘটনা ঘটেছে।

আটক তিনজনের মধ্যে একজন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এএসআই শ্যামল সাহা। অপর দুজনের একজন কনস্টেবল হানিফ এবং অন্যজন পুলিশের সোর্স জাহিদ। তল্লাশির শিকার দুই শিক্ষার্থী কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সিয়াম ও অর্প।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিউশন শেষে রেসকোর্স এলাকার একটি গলি দিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ধরতে যাওয়ার সময় দুই শিক্ষার্থীর পথরোধ করে তাঁদের তল্লাশি করা হয়। এ সময় নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিলেও পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তা দেখাতে পারেননি ওই ব্যক্তিরা। এতে শিক্ষার্থীদের সন্দেহ হয়।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ওই তিনজন তাঁদের পকেটে হাত দিয়ে তল্লাশি করছিলেন। পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা পুলিশ সদস্য বলে দাবি করেন। তবে পরিচয়পত্র না দেখিয়ে ওয়াকিটকি ও হ্যান্ডকাফ দেখান। পরে তাঁদের ভুয়া পুলিশ সন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়।

শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, টিউশন শেষে রেসকোর্সের গলি দিয়ে ফেরার পথে পুলিশ পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাঁদের পথরোধ করে তল্লাশি চালান। পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গে অসদাচরণও করা হয় বলে দাবি করেন সিয়াম। ঘটনাস্থলে থাকা অপর দুজনও নিজেদের পরিচয় দিতে পারেননি।

তবে এএসআই শ্যামল সাহার ভাষ্য, তাঁরা দুই শিক্ষার্থীকে দেখে তাঁদের পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। শিক্ষার্থীরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়ার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয় এবং দুঃখ প্রকাশ করা হয়। পরে শিক্ষার্থীরা তাঁদের পরিচয় জানতে চাইলে ওয়াকিটকি ও হ্যান্ডকাফ দেখানো হয়। পাশাপাশি ডিউটিতে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলেছিল।

শ্যামল সাহা বলেন, পরিস্থিতি দেখে তিনি সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাঁদের জোর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন।

পরে শিক্ষার্থীরা ওই তিনজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোতোয়ালি থানার একজন এসআই, একজন কনস্টেবল ও পুলিশের একজন সোর্স ছিলেন। তাঁরা শিক্ষার্থীদের তল্লাশি করার চেষ্টা করেছিলেন। শিক্ষার্থীরা তাঁদের পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তাঁরা তা দেখাতে পারেননি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানার কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের বাক্‌বিতণ্ডা হয়। পরে শিক্ষার্থীরা তাঁদের জোর করে গাড়িতে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসে। এভাবে কাউকে তুলে না এনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো উচিত ছিল। একইভাবে পুলিশ সদস্যদেরও পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা উচিত ছিল। ফলে উভয় পক্ষেরই কিছু ঘাটতি ছিল।’

প্রক্টর আরও বলেন, ‘উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আমরা যৌক্তিক জায়গায় এসে বিষয়টির সমাধান করেছি এবং উভয় পক্ষই তা মেনে নিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তায়িন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, ‘উভয়েরই ভুল ছিল। ঘটনাস্থলে যা হয়েছে, তখন কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা থানায়, এমনকি ৯৯৯-এ কল দিলেও বিষয়টি সমাধান করা যেত। ঘটনার পর বাসে করে নিয়ে আসাটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে একটা মব কালচারের রেশ ছিল। সেখান থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *