চকলেট নেবেন, চকলেট… রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে ছোট্ট গলায় বারবার ডাকছিল শিশুটি। চারপাশে মানুষের ব্যস্ত চলাচল। কেউ হেঁটে যাচ্ছেন, কেউ রিকশায় ছুটছেন, কেউ নিজের কাজে মগ্ন। এই ব্যস্ত শহরে কারও হাতে সময় নেই, কারও চোখে পড়ছে না ফুটপাতে বসে থাকা ছোট্ট শিশুটিকে। অথচ তার গলার ডাকের মধ্যে লুকিয়ে আছে একবুক অভাব, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার তাগিদ।
শিশুটির নাম কাওছার। বয়স মাত্র চার বছর। যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা রঙিন খেলনা, ছবির বই কিংবা পেনসিল, সে বয়সে তার সামনে সাজানো চকলেট আর চুইংগাম।
যে বয়সে মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর কথা, সেই বয়সেই তাকে বসতে হয়েছে ফুটপাতে। জীবনের কঠিন হিসাব বুঝে ওঠার আগেই যেন জীবনের বোঝা এসে চেপেছে তার ছোট্ট কাঁধে।
ফুটপাতে একটি কাগজ বিছিয়ে তার ওপর সাজিয়ে রেখেছে ২৪টি চকলেট ও চুইংগাম। প্রতিটির দাম পাঁচ টাকা। ছোট্ট দোকানটির পুঁজি সামান্য, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাওছারের ক্ষুধা মেটানোর আশা। কেউ কিনলে হয়তো দিনের শেষে জুটবে কিছু খাবার।
কাওছারের গায়ে ময়লা গেঞ্জি, পরনে হাফপ্যান্ট। পোশাকে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। হাতে একটি ফিতা। বসে বসে সেই ফিতা নিয়ে খেলছিল সে। কখনো ফিতাটি নাড়ছিল, কখনো নিজের মতো করে খেলায় মেতে উঠছিল। শিশুমনের স্বাভাবিক চঞ্চলতা তার মধ্যে আছে। কিন্তু সেই চঞ্চলতার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা। খেলার বয়সে তাকে বসে থাকতে হচ্ছে রাস্তায়, ক্রেতার অপেক্ষায়।
তার পাশে পড়ে আছে একটি পুরোনো, মলিন ব্যাগ। চারপাশে ধুলাবালি, মানুষের পদচারণা, যানবাহনের শব্দ। এটাই যেন তার ছোট্ট পৃথিবী। এখানেই বসে সে ক্রেতা ডাকে, এখানেই সময় কাটায়, এখানেই তার দিন পার হয়। পথচারীদের কাছে ফুটপাত হয়তো চলার পথ, কিন্তু কাওছারের কাছে সেই ফুটপাতই উপার্জনের জায়গা।
কাওছারের বাবা নেই। তার মা ভিক্ষা করেন। পরিবারের এই অসহায় বাস্তবতার মধ্যে ছোট্ট শিশুটিও নেমে পড়েছে উপার্জনের চেষ্টায়। সে স্কুলে যায় না। বই-খাতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে বসা, শিক্ষকের কাছে পড়া শেখা কিংবা সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা- এসব তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠেনি। তার শৈশবের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে ফুটপাত আর চকলেট বিক্রির চেষ্টা।
সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর। চকলেট বিক্রি করে পাওয়া টাকা দিয়ে সে কী করবে? কাওছার জানায়, সে ভাত খাবে।
কী অদ্ভুত সরল একটি চাওয়া! এই বয়সে একটি শিশুর স্বপ্ন হতে পারে নতুন খেলনা, পছন্দের খাবার কিংবা মায়ের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। কিন্তু কাওছারের কাছে সেই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একবেলা ভাত। তার ছোট্ট পৃথিবীতে ক্ষুধা এতটাই বাস্তব যে উপার্জনের টাকায় কী কিনবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাকে ভাবতে হয় না। সে জানে, তার খিদে পেয়েছে। সে ভাত খেতে চায়।
এই উত্তর শুনলে মনে প্রশ্ন জাগে, যে বয়সে একটি শিশুর খাবার, নিরাপত্তা ও শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার কথা বড়দের, সেই বয়সে কেন তাকে খাবারের আশায় ফুটপাতে বসতে হবে? কেন তার ছোট্ট হাতকে উপার্জনের জন্য বাড়িয়ে দিতে হবে? কেন তার শৈশবের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যাবে অভাবের কঠিন বাস্তবতা?
কাওছার হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর জানে না। সে জানে না দারিদ্র্য কেন আসে, কেন কারও জীবনে এত অভাব থাকে, কেন অন্য শিশুরা স্কুলে যায় আর তাকে বসে থাকতে হয় রাস্তার ধারে। সে শুধু জানে, চকলেট বিক্রি করতে হবে। কেউ কিনলে টাকা পাওয়া যাবে। আর সেই টাকা দিয়ে ভাত খাওয়া যাবে।
‘চকলেট নেবেন, চকলেট!’-তার এই ডাক তাই কেবল পণ্য বিক্রির আহ্বান নয়। এর মধ্যে শোনা যায় একটি শিশুর বেঁচে থাকার আকুতি। শহরের অসংখ্য শব্দের ভিড়ে তার কণ্ঠ হয়তো হারিয়ে যায়, কিন্তু তার কথাগুলো আমাদের মনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি সত্যিই আমাদের চারপাশের অসহায় শিশুদের দেখতে পাই?
ফুটপাতের সেই ছোট্ট কাগজে সাজানো ২৪টি চকলেট ও চুইংগাম হয়তো খুব সামান্য পুঁজি। কিন্তু কাওছারের কাছে এর প্রতিটির মূল্য অনেক। কারণ, প্রতিটি বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার একবেলা খাবারের আশা।