পাবনার মেধাবী ছাত্র থেকে দেশের খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক

বাংলাদেশের পদার্থবিজ্ঞানের জগতে অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক একটি পরিচিত নাম। দীর্ঘ শিক্ষকতা ও গবেষণাজীবনে তিনি দেশের বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে তার গবেষণা উল্লেখযোগ্য।

মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের শিক্ষাজীবনের শুরু পাবনায়। ১৯৫৭ সালে পাবনার রাধানগর মজুমদার একাডেমি থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার অধীনে প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশন পাস করেন তিনি।

এরপর ১৯৫৯ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। পরে রাজশাহী সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬১ সালে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

অনার্সের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে সেখানেও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন। একই বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথেও বাধা

১৯৬৫ সালে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেয়েছিলেন অধ্যাপক বসাক। কিন্তু সে সময় পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে তার পাসপোর্ট জব্দ থাকায় সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে নতুন পাসপোর্ট পান তিনি। এরপর কমনওয়েলথ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডে যান। ১৯৭৫ সালে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

শিক্ষকতা ও গবেষণায় দীর্ঘ পথচলা

দেশে ফিরে অধ্যাপক বসাক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা ও গবেষণা করেন। ২০০৮ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। পরের বছর, ২০০৯ সালে, তার দীর্ঘদিনের শিক্ষা ও গবেষণার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান এবং স্কুল অব ফিজিক্যাল সায়েন্সের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সেন্টার প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তার নাম জড়িয়ে আছে। তার উদ্যোগে উত্তরাঞ্চলে প্রথম কম্পিউটার স্থাপনের কথাও উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতেও একাধিকবার রিসার্চ প্রফেসর হিসেবে কাজ করেছেন।

নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে অবদান

অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র নিউক্লীয় তত্ত্ব। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে তার গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার ১৩৯টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং এসব গবেষণার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উদ্ধৃতি বা সাইটেশন রয়েছে।

শুধু গবেষণাই নয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্যও তিনি লিখেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার ‘ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান’ বই।

পেয়েছেন নানা সম্মাননা

শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অধ্যাপক বসাক বিভিন্ন পুরস্কার ও বৃত্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গোল্ড মেডেল, মেরিট স্কলারশিপ, SEATO স্কলারশিপ এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স গোল্ড মেডেল।

২০০৬ সালে ফিজিক্যাল সায়েন্সে অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স গোল্ড মেডেল লাভ করেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনেও তিনি প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

তার নামে চালু হয়েছে বৃত্তি

অধ্যাপক বসাকের শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার প্রতি অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেনিনসুলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ২০০৭ সাল থেকে ‘প্রফেসর বসাক পুরস্কার ও বৃত্তি’ চালু করেছে। এর আওতায় প্রতিবছর চারজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি এবং দুইজন কৃতি শিক্ষার্থীকে ক্রেস্ট ও আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।

পাবনার একজন মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে দেশের খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী হয়ে ওঠা অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের জীবন তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষা, গবেষণা ও মেধাচর্চারও একটি দীর্ঘ পথচলার গল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *