রাত নামলেই মৃত্যুফাঁদ মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে

দিনের আলোয় যাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন। তবে রাত নামলেই বদলে যায় চিত্র। নেমে আসে নীরবতা, অন্ধকার আর আতঙ্ক। নিরাপত্তা ক্যাম্প না থাকা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকা এবং ফুট ওভারব্রিজের অভাবে রাতের ট্রেনের যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা ও যাত্রীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্টেশনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় সুযোগ বুঝে ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে নারী যাত্রীরা ইভটিজিং ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গভীর রাতে প্ল্যাটফর্মে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের অন্যতম বড় সমস্যা ফুট ওভারব্রিজ না থাকা। এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে যেতে যাত্রীদের সরাসরি রেললাইন পার হতে হয়। ট্রেন আসা-যাওয়ার সময়ও অনেককে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হতে দেখা যায়। এতে শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়েন। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন যাত্রীরা।

সম্প্রতি ২৬ সেপ্টেম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে উঠতে গিয়ে রাবেয়া খাতুন নামে এক নারী যাত্রীর দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় স্টেশনের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা থেকে খুলনাগামী চিত্রা এক্সপ্রেসের যাত্রী আরিফ হোসেন ও মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘রাতের বেলায় স্টেশনে নিরাপত্তার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রশাসনের লোকজন তেমন দেখা যায় না। স্টেশনের প্রধান সড়ক, প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশের এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। এতে অনেক যাত্রী ভয় পান এবং সকাল হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্ত থেকে বাবরা রেলগেট পর্যন্ত দুই পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। ফলে চুরি-ছিনতাইয়ের আশঙ্কা থাকে। এছাড়া রেললাইনের বিভিন্ন ল্যাম্পপোস্টে বাতি থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় সেগুলো জ্বলে না।

গভীর রাতে প্ল্যাটফর্মে মাদকসেবীদের আনাগোনার অভিযোগও রয়েছে। অন্ধকার ও নিরাপত্তাকর্মীর স্বল্পতার সুযোগে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলে স্থানীয়রা জানান। তাদের দাবি, মাদকের আড্ডা বন্ধ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশনে সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন।

এদিকে স্টেশনে যাতায়াতের একমাত্র প্রধান সড়কটির অবস্থাও বেহাল। খানাখন্দে ভরা সড়ক দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন চলাচলে প্রায়ই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন যাত্রী ও এলাকাবাসী।

মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন দিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। খুলনা-ঢাকা রুটের বেনাপোল এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, চিত্রা এক্সপ্রেস ও নকশীকাঁথা লোকাল ট্রেনসহ বিভিন্ন ট্রেন এ স্টেশনে যাতায়াত করে। এছাড়া রাজশাহীগামী সাগরদাঁড়ি ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস এবং চিলাহাটিগামী সীমান্ত এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন লোকাল ট্রেনও এ স্টেশন হয়ে চলাচল করে।

স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে প্রায় ৬০০ থেকে ৯০০ যাত্রী বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন। বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চাপ থাকলেও স্টেশনটি আধুনিকায়ন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার শাহাজান শেখ বলেন, ‘এই স্টেশন থেকে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৯০০ যাত্রী বিভিন্ন প্রান্তে আসা-যাওয়া করেন। স্টেশনটি আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন এবং ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হলে যাত্রীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’

কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুলফিকার আলী বলেন, ‘আমি সবেমাত্র যোগদান করেছি। মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের যাত্রীদের, বিশেষ করে রাতের বেলায়, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন অভিমুখের প্রধান সড়কটি সংস্কারের জন্য আমি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তাটির কাজ করতে রেল কর্তৃপক্ষের আপত্তি থাকায় তা করা সম্ভব হয়নি। সড়কবাতির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে লাইট দেওয়ার ব্যবস্থা করব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *