​প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের সৎকার করলেন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কাজল

মা হারানোর চরম বেদনার দিনেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর আট বছরের বন্দিদশার ভারী শৃঙ্খল মাথায় নিয়ে শেষবারের মতো মায়ের মুখখানি দেখার সুযোগ পেলেন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি কাজল চন্দ্র মহন্ত। দীর্ঘ আটটি বছর কারা প্রাচীরের অন্তরালে কাটিয়ে বুধবার দিবাগত রাতে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী মহাশ্মশানে মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন তিনি। ডা. সাধন চৌধুরীর স্ত্রী হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কাজল চন্দ্র মহন্ত ফুলবাড়ী উপজেলার কাঁটাবাড়ী গ্রামের মৃত কার্তিক চন্দ্র মহন্ত ও রিনা রানী মহন্তের একমাত্র সন্তান। গত বুধবার সকালে অসুস্থতাজনিত কারণে তার মা রিনা রানী মহন্ত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মায়ের এই আকস্মিক প্রয়াণে শোকস্তব্ধ পরিবারের পক্ষ থেকে শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের জন্য আইনি প্রক্রিয়া মেনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলে তা মঞ্জুর করা হয়। এরপর প্রশাসনের কঠোর ও কড়া পাহারায় তাকে ফুলবাড়ী মহাশ্মশানে নিয়ে আসা হয়। শ্মশানের চাতালটিতে যখন সনাতন ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী মায়ের মুখাগ্নি ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছিল, তখন চারপাশের বাতাসে মিশে ছিল এক বুক অভিমান আর বুকফাটা কান্নার রোল। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্যে উপস্থিত স্বজন ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের চোখে জল নেমে আসে, সৃষ্টি হয় এক চরম আবেগঘন ও হৃদয়বিদারক পরিবেশ। প্রায় এক ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত অথচ না পাওয়ার বেদনায় ভারাক্রান্ত সময়ে ফুলবাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহমুদ আলম লিটনসহ এলাকার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সাবেক মেয়র মাহমুদ আলম সাংবাদিকদের জানান যে, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কাজলকে সৎকারে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই মানবিক ও মর্মস্পর্শী বিষয়টি নিশ্চিত করে দিনাজপুর জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. মাইনউদ্দিন ভূইয়া জানান যে, সৎকার কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরপরই কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কাজল চন্দ্র মহন্তকে পুনরায় দিনাজপুর জেলা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বী একজন নাগরিকের জীবনের এই ট্র্যাজেডি এবং মায়ের শেষ বিদায়ের ক্ষণে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবিক সুযোগ প্রাপ্তি যেমন সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে, তেমনি সব মানুষের মৌলিক অধিকার ও বিচার ব্যবস্থার মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্নটিকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *