প্রায় সাত দশক ধরে একসঙ্গে সংসার করছেন সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগম। দীর্ঘ এই পথচলায় স্বচ্ছলতা তাদের জীবনে স্থায়ী হয়নি। একসময় কাঁচামালের ব্যবসা করে কোনো রকমে সংসার চালালেও বয়সের ভারে এখন কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন সাজু। অন্যদিকে প্রায় ছয় বছর ধরে শয্যাশায়ী স্ত্রী নূরজাহান। খাবারের সংকট আর চিকিৎসার অভাবে জীবনের শেষ সময়টা কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পার করছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। তবে দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও একে অপরের সঙ্গ ছাড়েননি তারা।
শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের এই দম্পতিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও সম্প্রতি মানুষের নজর কেড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে স্ত্রী নূরজাহানকে কোলে তুলে কাঁদছেন সাজু শেখ। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি খাবারের জন্য আল্লাহর কাছে আকুতি জানান এবং স্ত্রীকে নিয়ে চরম কষ্টে থাকার কথা বলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। তাদের কেউ কেউ সুযোগ পেলেই বাবা-মায়ের খোঁজ নেন। তিন ছেলের একজন করোনাকালে নিখোঁজ হন। মাঝেমধ্যে তার খোঁজ পাওয়া গেলেও নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে থাকেন না। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান এবং বছরে এক-দুবার বাড়িতে ফেরেন। সন্তানরাও নিজেদের অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটাচ্ছেন।
বৃদ্ধ দম্পতির ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি করার পাশাপাশি ঠেলাগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজের সংসারেই আর্থিক সংকট থাকলেও সামর্থ্য অনুযায়ী বাবা-মায়ের খরচ ও দেখাশোনা করার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে নিজের পরিবার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে বৃদ্ধ মা-বাবার সব প্রয়োজন মেটানো তার পক্ষে সম্ভব হয় না। কয়েক বছর আগে তার স্ত্রীও চিকিৎসার অভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
প্রায় ছয় বছর আগে পা পিছলে পড়ে কোমরের হাড়ে গুরুতর আঘাত পান নূরজাহান। এরপর থেকে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেননি তিনি। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করানো সম্ভব হয়নি। স্ত্রীকে দেখাশোনার পাশাপাশি তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন সাজু শেখ।
বয়সকালে কাঁচামালের ব্যবসা করে সংসার চালালেও এখন বয়সের কারণে কোনো কাজ করার সক্ষমতা নেই সাজুর। ফলে একদিকে নিজের ও স্ত্রীর খাবারের ব্যবস্থা, অন্যদিকে নূরজাহানের চিকিৎসা—দুই ক্ষেত্রেই অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।
গত ৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় এক ব্যক্তি তাদের দুর্দশার একটি ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিষয়টি নজরে আসার পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে।
সমাজকর্মী শামীম আহমেদ বলেন, “দারিদ্র্যের কাছে জীবনের অনেক মানুষকে হার মানতে হয়। তবে কখনো কখনো মানুষের ভালোবাসা ও সম্পর্কের দৃঢ়তার কাছে দারিদ্র্যও পরাজিত হয়। শেরপুরের এই প্রায় ৮০ বছর বয়সী দম্পতির ক্ষেত্রেও সেটিই দেখা গেছে। শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্য তাদের ভালোবাসার বন্ধনকে দুর্বল করতে পারেনি।”
রক্তসৈনিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল আমিন রাজু জানান, “ভিডিওটি দেখার পর তিনি দ্রুত তাদের বিষয়ে খোঁজ নেন। পরে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রায় দেড় মাসের প্রয়োজনীয় খাবার সাজু শেখের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।”
সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটি শেরপুরের সভাপতি আলমগীর আল আমিন বলেন, “খবর পাওয়ার পর তারা ওই দম্পতির খোঁজ নিয়েছেন। বর্তমানে তাদের কাছে মোটামুটি পরিমাণ খাবার রয়েছে। তবে চিকিৎসার বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। কারণ দুজনই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।”
এদিকে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরেও এসেছে। শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “বৃদ্ধ দম্পতির ভিডিওটি তার নজরে এসেছে। তাদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া হবে। এরপর সরকারি ও নাগরিক হিসেবে তাদের যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, সেগুলো দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
প্রায় ৭০ বছরের সংসারজীবনে স্বচ্ছলতার দেখা না পেলেও একে অপরের প্রতি নির্ভরতা ও ভালোবাসা ধরে রেখেছেন সাজু ও নূরজাহান। জীবনের শেষ সময়ে তাদের চাওয়াও খুব সীমিত—দু’বেলা খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পাশে থাকা প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে বেঁচে থাকা।