দেবব্রত সরকার, গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
বেশ কিছুদিন যাবত মতুয়া সমাজে একটি অস্থিরতা বিরাজ করছে।বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মতুয়ারা বিভ্রান্ত। কখনো শ্রী ধাম ওড়াকান্দীর স্থাপনা তৈরি, কখনো শ্রাদ্ধ ও বিবাহ বিষয়ক, কখনো রাজনৈতিক ইস্যু এবং সর্বশেষ সংযোজন উপাধি তত্ত্ব। মতুয়াচার্য,মহামতুয়াচার্য,মতুয়ারত্ন,মতুয়া সাহিত্যরত্ন,মতুয়া চলমান শাস্ত্রসিন্ধু, প্রতিভূ অবতার এবং সর্বশেষ সংযোজন মতুয়া সম্রাট। এই সমস্ত উপাধি সমুহ যারা প্রদান করেন এবং যাঁরা গ্রহণ করেন এদের মধ্যে একটা যোগাযোগ রয়েছে। এরা সবাই গন্ডিবদ্ধ। গন্ডির মধ্য থেকে কেহ বের হয়না। প্রকারান্তরে দেখা যায় এরা কেহ কেহ ঠাকুর পরিবার কেন্দ্রীক এবং কেহ কেহ আবার ঠাকুর ও ঠাকুর পরিবারের বিরোধী। এদের অনেকেই ঠাকুর বাড়ির গোষ্ঠীদ্বন্ধকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। বৃহত্তর মতুয়া সমাজে এদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। কারন এরা সম্প্রতি শ্রী শচীপতি ঠাকুরের পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্নের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সকল মতুয়া সমাজকে ঠাকুর, ঠাকুরবাড়ি ও শ্রী ধাম ওড়াকান্দী পরিত্যাগের আহ্বান জানিয়েছিলেন।তাদের আহ্বানে একজন মতুয়াও শ্রী ধামে আসা বন্ধ করেছে কিনা জানিনা। তবে তারা বৃহত্তর মতুয়া সমাজের কাছে হাস্যোস্পদে পরিনত হয়েছে, এটা নি:সন্দেহে বলা যায়।বৃহত্তর মতুয়া সমাজের এখন প্রশ্ন কলিযুগের মহাতীর্থ শ্রী ধাম ওড়াকান্দী পরিত্যাগের আহ্বান করার দু:সাহস এরা কোথায় পায়।এরা কি মতুয়া না মতুয়া নামধারী মতুয়াদের ক্ষতিকারী দালাল চক্র।
দুইশত বছরের মতুয়া ইতিহাসে বর্তমান দশক মতুয়াদের কাছে জ্বাজল্যমান। এই দশকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীধাম ওড়াকান্দি দর্শন করে পূজা প্রার্থনা করেছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় মন্ত্রীর সম্মাননা প্রাপ্তি, লোকসভা, রাজ্যসভা ও বিধানসভায় আসন প্রাপ্তি,বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব। এছাড়া ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মতুয়ারা সক্রিয় ও সচেতন। সোশ্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মতুয়াদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। মতুয়াদের এই উত্থান সর্বজনবিদিত। অন্যদিকে মতুয়া নামধারী একটি গোষ্ঠী মতুয়াদের অন্ধকারে নিক্ষেপ করার জন্য সদা তৎপর। এটা অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন তার বিখ্যাত তৃতীয় সূত্রে বলেছেন “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে”।
মতুয়াদের পিছনে টেনে ধরা লোকের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। তাদের প্রধান কাজ মতুয়া আদর্শের বুলি আওড়িয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা। এরা পি আর ঠাকুর,মুকুন্দ মল্লিক, কুবের বিশ্বাস,মহানন্দ হালদার মহোদয়দের নিকট থেকে নিকট কোন শিক্ষা গ্রহণ করেননি। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্মতা তৈরীর মেলবন্ধন এরা শেখেনি।শ্রী গুরুচাঁদের শিক্ষা আন্দোলন দিনেকের বক্তব্য দেখুন এদের নিকট বক্তব্যের উদাহরণ ও বুলি মাত্র। শিক্ষা আন্দোলনের ফলাফলএরা কুক্ষিগত করে ফেলেছে। একজন ড.মিহির কান্তি মজুমদার,বনজ কুমার মজুমদার, ড.তপন বাগচি,ড.স্বরোচিষ সরকার ড.দেবোদ্যুতি সরকার যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট তৈরি করতে পারে এটা তাদের কল্পনার বাহিরে।
নিজেদের মানুষদের নিকট থেকে ” কন্ট্রাক্ট উপাধি” গ্রহণ না করে রাষ্ট্রীয় উপাধি অর্জনের জন্য নিজেদের তৈরি করুন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৈরি হতে সাহায্য করুন। একটি একুশে পদক, একটি স্বাধীনতা পদক,একটি বাংলা একাডেমি পদক, ভারতের পদ্মশ্রী পদক প্রাপ্তির প্রত্যাশা তৈরি করার চেষ্টা করুন বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রত্যাশা তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করুন । তবেই কৃতিত্ব।
মতুয়াচার্য,মহামতুয়াচার্য,মতুয়ারত্ন,মতুয়া সাহিত্যরত্ন, মতুয়া চলমান শাস্ত্রসিন্ধু,প্রতিভু অবতার, মতুয়া সম্রাট এই উপাধি গুলো কারা প্রচলন করেছেন, প্রেক্ষিত কি,পুরস্কার প্রাপ্তির মানদন্ডকি কিছুই কোথাও লেখা নেই,কেহ জানেও না, কেহ বলতেও পারে না। ঠাকুরবাড়ি কেন্দ্রিক মতুয়াদের পৃথক দুইটি সংগঠন রয়েছে। একটি মতুয়া মহাসংঘ, অন্যটি শ্রী শ্রী হরি গুরুচাঁদ মতুয়া মিশন (মতুয়া কথাটি অধুনা সংযোজিত)। এই দুইটি সংগঠনও মাঝে মধ্যে অনিয়মিত ভাবে পদক প্রদান করে থাকে। তারা তাদের পছন্দ মত লোকদের পদক দেয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল সেখানেও কোন মাপকাঠি নেই, নেই পদক প্রাপ্তির যোগ্যতা বা মানদন্ডের উল্লেখ।যারা বা যে সমস্ত মতুয়ারা এদুটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের মোসাহেবি করতে পারে তারাই ঐ পদক প্রাপ্ত হয়। মতুয়াচার্য, মহামতুয়াচার্য, প্রতিভু অবতার, মতুয়ারত্ন, মতুয়া সম্রাটসহ অন্যান্য পদবী সমুহ অধিকাংশই স্বঘোষিত।
একটি পদক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।পদক প্রদানের নিজস্ব একটা নিয়ম থাকবে, একটা মানদণ্ড থাকবে, একটা অথরিটি বা কাঠামোগত স্বীকৃত সংগঠন থাকবে।এখন যারা পদক প্রদান করে তাদের এইসব আছে কিনা তারাই ভালো বলতে পারবে। রাতারাতি গজিয়ে ওঠা সংগঠনসমূহ তাদের নিজেদের লোকজনকে পদক প্রদান করছে। অথচ গোলক পাগল,হীরামন, তারককর্তা, গোপালসাধু, বিপিন কর্তা,নিবারন সাধু,তারিনী বল,নিবারন গোঁসাই, রমনী গোসাই, বিচরন পাগল,দেবী গোসাই,অশ্বিনী গোসাই এদের কোন পদকের প্রয়োজন হয়নি।
যারা ঠাকুরের পারিষদ বর্গ ছিলেন তারা ঠাকুরের নাম প্রচারের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন তারা কোন পদক গ্রহণ করেননি, তাদের কোন পদকের প্রয়োজনও হয়নি। এখন তথাকথিত এইসব নব্য মতুয়াদের পদক প্রদান ও গ্রহণের শিশু সুলভ আচরন দেখলে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়।