চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুধবার (২৯ জুলাই) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও যশোর জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে তাকে আটক করা হয়। অভিযানে ডেভিড ইমন ছাড়াও আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। তিনি জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে সংঘটিত একাধিক চাঁদাবাজি, হামলা ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডেভিড ইমনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে বুধবার যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ধুমধুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় যৌথ পুলিশ দল।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যাতে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর তদন্ত এগিয়ে নেয়া যায়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয়ভাবে সাধারণ জীবনযাপন করলেও পরবর্তীতে তিনি আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দেন। এরপর একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তার নাম জড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি আলোচনায় আসেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি ধীরে ধীরে ওই সন্ত্রাসী চক্রের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতৃত্বে পরিণত হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন এবং দুবাই থেকে মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করতেন। দাবি অনুযায়ী অর্থ না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে হামলা কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনা ঘটানো হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত হামলার তদন্তে ডেভিড ইমনের নাম সামনে আসে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১১ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপে কল করে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়।
এর দুই দিন পর নগরের চন্দনপুরা এক্সেস রোডে অবস্থিত ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাকারীরা অফিসের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, আসবাবপত্র ও কাচের দরজা ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অফিস থেকে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকাসহ একটি ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ঘটনার পর র্যাব ও পুলিশ পৃথক অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অন্তত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার রাতে চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনের দুই সহযোগী মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফকে (২৪) গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। তাদের মধ্যে আসিফ একটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি ছিলেন।
সিএমপি জানায়, আসিফকে গ্রেপ্তারের সময় তার কোমর থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে আরিফের কাছ থেকেও দুই রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে পরিচয় দেন এবং দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছেন বলে পুলিশের দাবি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওই দুই সহযোগীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ডেভিড ইমনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর যশোরে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানিয়েছিলেন, ডেভিড ইমনসহ পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত টিম একযোগে কাজ করছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিড ইমন ও তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাদের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অবৈধ অস্ত্রের উৎস, অর্থের যোগান, সহযোগীদের পরিচয় এবং চট্টগ্রামে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ততার বিষয়ে আরও তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রয়োজনে নতুন মামলাও যুক্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।