বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন আর নেই - sanatanitv

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন আর নেই

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ১৩, ২০২৬

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আর নেই। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ ৮৩ বছর বয়সে গতকাল বুধবার (১৩ মে) সকাল ১০টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারনী ফোরাম-প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসন থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

২০১৯ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রাপ্ত, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধিকারী প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এস রহমানের সন্তান। মোশাররফ হোসেন ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন মিরসরাইয়ের ধুম ইউনিয়নে। তার দাদাও ছিলেন জনপ্রতিনিধি।

তিনি ২০ বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দায়িত্ব পালন করেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতি হিসেবে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফার যৌক্তিকতা তুলে ধরে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তানে অধ্যয়নরত ছাত্রদের সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের এক সমাবেশে তিনি সভাপতিত্ব করেন।

 

লাহোর থেকে দেশে ফিরে এম.এ. আজিজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হন। ১৯৭০ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

২৫ মার্চ ১৯৭১ এর বিধ্বংসী কালরাত চট্টগ্রামে পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চট্টগ্রামের সিনিয়র অবাঙালী অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফতেমিকে আদেশ দেওয়া হয়।

তারা কুমিল্লা থেকে অতিরিক্ত সৈন্য চট্টগ্রাম এনে গণহত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করে। কিন্তু চট্টগ্রামে কালরাত্রির নৃশংসতা ঠেকাতে ১ নম্বর সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে সাহসী বীর বাঙালি যোদ্ধারা শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে কুমিল্লা থেকে আসা সেনাদলের পথ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে তিনি ভারত চলে যান এবং সি.ইন.সি স্পেশাল ট্রেনিং নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করেন।

স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে তিনি বিরোধী দলীয় হুইপের এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন। তার দায়িত্বকালেই এই মন্ত্রণালয়ের বড় বড় প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল।

১৯৭৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বাকশাল এবং ’৭৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৮০ ও ৮৪ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯২, ১৯৯৬, ২০০৪ এবং ২০১২ সালে সভাপতি এবং একই সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি চট্টগ্রামের স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী সমিতির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন সৎ, ভদ্র, নম্র, স্পষ্টবাদী ও উদার মনোভাবের মানুষ হিসেবে নিজ দলের নেতাকর্মীসহ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের নিকট তার সুনাম রয়েছে। রাজনীতি করতে গিয়ে এ সুদীর্ঘ সময়ে তিনি কখনও কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেননি এবং কোন সন্ত্রাসী লালন করেননি। তিনি কখনও নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপোষ করেননি।

১৯৭৫ পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আহবান তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজ দলের আদর্শে অবিচল থেকেছেন সব সময়। রাজনীতি করতে এসে মুক্তিযুদ্ধসহ বহুবার তিনি জীবন মৃত্যুর মুখোমুখী হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী আয়েশা সুলতানা, মিরসরাই আসনের সাবেক সংসদ্য মাহবুব রহমান রুহেলসহ তার তিন ছেলে এবং একজন মেয়েসহ অসংখ্য রাজনৈতিক অনুসারী, শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন সমিতির নেতৃবৃন্দ। এক বিবৃতিতে সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি দীপেন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মুস্তফা নঈম, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল মোমেন, যুগ্ম সম্পাদক কামাল উদ্দিন, কোষাধ্যক্ষ এহসানুল হক খসরুসহ কর্মকর্তারা গভীর শোক প্রকাশ করেন।

মরহুমের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল ১১টায় জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এর পর বাদ যোহর গ্রামের বাড়ি মীরসরাইয়ের ধুম ইউনিয়নের এস রহমান কলেজ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।