বিশ্ববিদ্যালয় বললে দেশের মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে—ছাত্ররা ছাত্রদের মারে, সবাই রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেছেন, তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বললে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মানসপটে কি ভেসে ওঠে জানেন? আতংকের ক্যাম্পাস। যেখানে ছাত্ররা ছাত্রদের মারে। যেখানে মিছিল হয়, জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো! যেখানে ছাত্র-শিক্ষক সর্বদা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কাঁদা ছোড়াছুড়ি করে। শিক্ষকদের ক্লাবে গেলে কোনো দিন দেখবেন না, শিক্ষকরা লেখাপড়া ও গবেষণা নিয়ে কথা বলছে। কথা হয় কে ভিসি হবে, কে ডিন হবে, কে প্রভোস্ট হবে, কে প্রক্টর হবে ইত্যাদি।’

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এসব কথা বলেছেন ঢাবি অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু স্নাতক স্তরে মোট আসন সংখ্যা কত জানেন? ৬ হাজার ১২৫টি। ভারতের এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয় হলো ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স। সেখানে সেখানে স্নাতক স্তরে মোট আসন সংখ্যা কত জানেন? মাত্র ৭০৮টি।’

তিনি বলেন, ‘৬১২৫ আসন সংখ্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ কত জানেন? ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর ৭০৮ আসনের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স এর বরাদ্দ কত জানেন? ১ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। ছাত্র সংখ্যার দিক থেকে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৮ গুনের চেয়ে বেশি বড়। তাহলে বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল ন্যূনতম ১৩ হাজার কোটি টাকা।’

তার ভাষ্য, ‘তাহলেই কেবল প্রায় ৪০ হাজার ছাত্র সত্যিকারের শিক্ষক পাবে, সেই শিক্ষক দিয়ে সত্যিকারের শিক্ষার্থীরা সত্যিকারের শিক্ষা পেয়ে উন্নত মানুষ হবে। সেই উন্নত মানুষ দিয়েই কেবল দেশ উন্নত হতে পারে।’

অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উন্নতমানের না করে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো মানে এই দেশের শিক্ষার্থীদের সাথে রাষ্ট্রের প্রতারণা করা। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ জানেই না, আসলে বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হওয়া উচিত।’

‘দিনের একটা অংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে ক্লাবে এসে আড্ডা হয় এবং রাতে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে ঘুমায়। ক্যাফেটেরিয়া বা অন্য এমন কোন জায়গা আছে, যেখানে ছাত্র-শিক্ষক মিলে এক সাথে লাঞ্চ করবে বা কফির সাথে আড্ডা বা গল্পের ছলে লেখাপড়া ও গবেষণা বা নানা বিষয় নিয়ে আড্ডা দেবে?’, যোগ করেন তিনি।

ছাত্ররা কিন্তু শ্রেণিকক্ষ থেকে শ্রেণিকক্ষের বািইরে বেশি শিখতে পারে, যা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত উল্লেখ করে অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, ‘এখানে নেই উন্নতমানের আবাসিক ব্যবস্থা। অধিকাংশ ছাত্র ব্যস্ত থাকে লিভিং এক্সপেন্স জোগাড় করতে ২-৩টি প্রাইভেট টিউটরি করে। শিক্ষকরা এক্সট্রা আয়ের জন্য ব্যস্ত থাকে একাধিক পার্ট-টাইম চাকুরী নিয়ে। এইটাকে কি বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়?’

এর উপর পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে শিক্ষক ব্যবস্থাটা পুরোপুরি মাফিয়াইজমের খপ্পরে। এইবার তাহলে ভাবুন এই দেশকে কিভাবে উন্নত করবেন? মেট্রোরেল বানিয়ে? উড়ন্ত রাস্তা বা এক্সপ্রেসওয়ে বানিয়ে? স্যাটেলাইট পাঠিয়ে? পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে?’

অধ্যাপক কামরুল হাসানের ভাষ্য, ‘উন্নত মানুষ না বানিয়ে এসব প্রজেক্ট বানালে এগুলোর কোনোটিই মানসম্মততো হবেই না বরং মানুষকে দুর্নীতিবাজ বানাবে এক্সাক্টলি এটাই হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *