বিয়ের ১০ বছর পর ৭ সন্তানের জন্ম, বাঁচানো গেল না কাউকেই

বিয়ের ১০ বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালুখালী গ্রামের সালমা বেগম। চিকিৎসকের পরীক্ষানিরীক্ষায় গর্ভে ৬টি সন্তানের কথা বলা হলেও তিনি স্বাভাবিকভাবে একে একে ৭টি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তবে অপরিপক্ব অবস্থায় জন্ম নেওয়া চার ছেলে ও তিন মেয়েসন্তানের কাউকেই বাঁচানো যায়নি।

একে একে সব কটি সন্তানের মৃত্যুতে ওই পরিবারে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন প্রসূতি সালমা বেগম।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কালুখালী গ্রামের লতিফ মোল্যার ছেলে মহসিন মোল্যার সঙ্গে ১০ বছর আগে সালমা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের পর মহসিন দীর্ঘ ৭ বছর সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় কর্মরত ছিলেন। তিন বছর আগে দেশে ফিরে বর্তমানে তিনি ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পাঁচ বছর আগে সালমা একবার সন্তানসম্ভবা হয়েছিলেন। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাতের কারণে বাচ্চাটি নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ ১০ বছর পর তিনি পুনরায় সন্তানসম্ভবা হন। চিকিৎসকেরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন, সালমার গর্ভে ৬টি সন্তান রয়েছে। কিন্তু সেই মেডিকেল রিপোর্ট ভুল প্রমাণিত করে তিনি ৭টি সন্তানের জন্ম দেন।

মহসিন মোল্যার মা জানান, গর্ভে ৬টি সন্তান থাকার খবর জানতে পেরে তাদের পরিবারে আনন্দের জোয়ার বইছিল। পুত্রবধূর সেবাযত্নেরও কোনো কমতি ছিল না। গত সোমবার (৪ মে) বিকেলে হঠাৎ করে সালমার পেটব্যথা শুরু হলে তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সেখানে মঙ্গলবার (৫ মে) রাতে তিনি প্রথম সন্তান প্রসব করেন। নবজাতকটি কিছুক্ষণ পর মারা গেলে মহসিনের বাবা মৃতদেহটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। এরপর রাতেই সালমা দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেন এবং কিছুক্ষণ পর সেই শিশুটিরও মৃত্যু হয়। পরে রাতেই যশোরের একটি কবরস্থানে শিশুটিকে দাফন করা হয়। পরদিন বুধবার রাতে একে একে আরও ৫টি সন্তানের জন্ম দেন সালমা বেগম। জন্মের বেশ কিছুক্ষণ পর এই শিশুগুলোরও মৃত্যু হয়।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কালুখালী গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি ৬টি সন্তানকে কবর দেওয়া হয়েছে।

নিজ হাতে নাতি-নাতনিদের দাফন করা মহসিনের বাবা লতিফ মোল্যা বলেন, ‘রাতে জন্ম নেওয়া ৫টি শিশুর মৃতদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে কবর খুঁড়ে আমি নিজের হাতে দাফন করি। নিজ হাতে এতগুলো শিশুকে দাফন করা যে কত বড় কষ্টের, তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। দীর্ঘ ১০ বছর পর আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু আল্লাহ পাক আমাদের নিরাশ করে দিলেন। আমার পুত্রবধূ এখনো যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন, সে যেন সুস্থ হয়ে আমাদের সংসারে ফিরে আসে।’

স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. সেলিম জানান, কালুখালী গ্রামের মহসিন মোল্যার সাতটি সন্তান হবে– এমন খবর জানতে পেরে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। সবার মধ্যে নবজাতকদের দেখার কৌতূহল ছিল। কিন্তু সন্তানগুলো মারা যাওয়ায় সবাই ব্যথিত হয়েছেন।

যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইলা মণ্ডল জানান, সালমা বেগম তার তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেন, ‘তার সন্তানগুলো অপরিপক্ব অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছে। সালমার পানি ভেঙে যায়। পাঁচ মাসে ২০০ গ্রাম করে ওজন হয়েছিল শিশুগুলোর। সবারই হার্টবিট ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কাউকেই বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *