দেশে প্রাপ্তবয়স্কের ১৬.৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। সংখ্যায় এটি সাড়ে তিন কোটির কাছাকাছি। অথচ বিপুল মানসিক রোগীর জন্য নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (সাইকিয়াট্রিস্ট) রয়েছেন মাত্র সাড়ে তিন শ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো সংকট রয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়েও চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এ ছাড়াও সামাজিক চাপ এসব রোগীর চিকিৎসা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। যে কারণে আক্রান্ত সাড়ে তিন কোটি রোগীর ৯২ শতাংশই চিকিৎসাসেবার বাইরে রয়েছেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম এম এ সালাউদ্দিন কাউসার খবরের কাগজকে বলেন, মেডিকেল কলেজের কারিকুলামেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি ছিল না। সম্প্রতি এটি যুক্ত হয়েছে। এখনো সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ নেই। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তো কল্পনাই করা যায় না। বিপুল রোগীর বিষয়টি বিবেচনা করে এ ব্যাপারে সরকারের দ্রুত কার্যকরী প্রদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা নিয়ে সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সরকারি খাতে প্রায় ৩৫০ জন নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট) রয়েছেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানান। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে দেশে ২৬০ জন সাইকিয়াট্রিস্ট, ৫৬৫ জন সাইকোলজিস্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ৭০০ নার্সের তথ্য পাওয়া গেছে।
চিকিৎসকরা জানান, দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত অধিকাংশই চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন। চিকিৎসকের সংকট, সামাজিক কুসংস্কার, অসচেতনতা ও সেবা নিতে অনীহার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে চান না অনেকে। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও মানসিক স্বাস্থ্যের রুগ্ণ অবস্থা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো ‘অভিজ্ঞতার কথা শোনা হোক: বাস্তব কণ্ঠস্বর, বাস্তব পরিবর্তন।’ অর্থাৎ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের মতামতের গ্রহণযোগ্যতা এতে বলা হয়েছে।
চিকিৎসার বাইরে অধিকাংশ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, দেশে ১৮ থেকে ৯৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। সাত থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আক্রান্তদের বড় অংশই চিকিৎসা নেন না। জরিপ অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো, মানসিক রোগ শনাক্ত, পরামর্শ ও দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর জার্নাল অব এফেকটিভ ডিসঅরডার্স সাময়িকী এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গবেষণায় শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, বিষণ্নতার চিত্র উঠে আসে। এতে দেখা যায় প্রাপ্তবয়স্কদের ৫.২ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতা রোগে ভুগছেন। নারীদের মধ্যে বিষণ্নতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যাকে অনেকেই স্বাভাবিক মন খারাপ কিংবা ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখেন। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে চিকিৎসকের কাছেও যেতে চান না। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি হয়, জটিলতা বাড়ে
অধ্যাপক ডা. এম এম এ সালাউদ্দিন কাউসার এ বিষয়ে বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট জানার পরও রোগী ও তার পরিবারের মধ্যে সামাজিক চাপ রয়েছে। মানসিক ডাক্তারের কাছে গেলেই তাকে পাগল ভাবা হয়। যা পরবর্তীতে বিয়ে, চাকরি ও বিভিন্ন সম্পর্কের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। যে কারণে অনেকে এই রোগ পুষে রাখেন।
সেবার ঘাটতি, বাড়তি ব্যয়
শুধু চিকিৎসক সংকট নয়, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের ঘাটতিও রয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসা তুলনামূলক ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক পরিবারের জন্য তা বড় বাধা। যে কারণে নিয়মিত চিকিৎসক দেখানো, কাউন্সেলিং ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।
এ জন্য দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পৃথক মনোরোগ বিভাগ চালু এবং সেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ পদায়নের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস (বিএপি)’ সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে শুধু বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর নির্ভর করলে চলবে না–মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিদ্যমান ‘ট্রিটমেন্ট গ্যাপ’ কমাতে সেবাকে ঢাকার বাইরে দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল ও ওষুধ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মেডিকেল কলেজগুলোতে মনোরোগ চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে। বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রকৃত চিত্র জানতে একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
ভয়, লজ্জা ও কুসংস্কার দূর করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার দেওয়া এক বাণীতে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দৃশ্যত স্বাস্থ্যবান অথবা নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়, বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য। সুতরাং, কোনোভাবেই মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অভিজ্ঞতার কথা শোনা: প্রকৃত কণ্ঠস্বর, প্রকৃত পরিবর্তন’-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করা মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করাই প্রকৃত পরিবর্তনের পূর্বশর্ত। বাণীতে তিনি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রান্তিক মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থা, টেলি-কাউন্সেলিং সম্প্রসারণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সরকারি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি গর্ভবতী মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য, শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।