গাইবান্ধায় রাম বিগ্রহ নির্মাণ স্থগিত ঘোষণা, অপসারণের দাবি - sanatanitv

গাইবান্ধায় রাম বিগ্রহ নির্মাণ স্থগিত ঘোষণা, অপসারণের দাবি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুন ১৩, ২০২৬

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে রামের বিগ্রহ নির্মাণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যে নির্মাণ কাজ স্থগিত করা হয়েছে। এরমধ্যেই ইমাম ওলামা পরিষদ সেটি অপসারণের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

সংগঠনটি শুক্রবার জুমার নামাজের পর উপজেলা সদরের চারমাথা মোড়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে নির্মাণাধীন বিগ্রহ অপসারণের দাবি জানায়।

এদিন জেলা সদরসহ অন্যান্য উপজেলাতেও একই দাবিতে কর্মসূচি হয়েছে বলে সংগঠনটির তরফে জানানো হয়েছে।
তবে এর একদিন আগে বৃহস্পতিবার বিকালে উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর মন্দির ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে রামের বিগ্রহ নির্মাণের কাজ আপাতত স্থগিত করার ঘোষণা দেন।
এ মন্দিরে রামের বিগ্রহ নির্মাণকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন ধরেই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর মধ্যে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে শুক্রবার সকাল থেকে পলাশবাড়ী উপজেলার চারমাথা মোড়, কোমড়পুর মোড় ও হাসবাড়ী এলাকায় বিপুল সংখ্যাক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
‘ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় বিগ্রহের কাজ স্থগিত’

সম্প্রতি পলাশবাড়ী উপজেলায় শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে রামের বিগ্রহ নির্মাণ কাজ শুরু করে মন্দির কর্তৃপক্ষ। কিছু কাজও হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এটি হবে ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ’ রাম বিগ্রহ।

এরপর এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর প্রভাব দেখা যায়। ইমাম ওলামা পরিষদের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এর নির্মাণ কাজ বন্ধের দাবি জানানো হয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বিকালে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রাম বিগ্রহের নির্মাণ কাজ স্থগিতের ঘোষণা দেন মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত।

এ সময় তিনি বলেন, “কোন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপে নয়। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, “আমরা বাঙালি। সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তবে মন্দিরের নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম চলমান থাকবে।”

এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপিন চন্দ্র বর্মণ, সহসাধারণ সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র বর্মণ, মন্দির প্রতিষ্ঠাতার অন্যতম উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস।

ইমাম ওলামা পরিষদের ৮ দফা দাবি

বৃহস্পতিবার বিকালে গাইবান্ধা ও পলাশবাড়ীতে সংবাদ সম্মেলন করে ইমাম ওলামা পরিষদ নির্মাণাধীন রাম বিগ্রহ অপসারণের দাবি জানায়।

পলাশবাড়ী উপজেলা মডেল মসজিদের হলরুমে এবং গাইবান্ধা পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে ইমাম ওলামা পরিষদ এই সংবাদ সম্মেলন করে।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বিগ্রহ নির্মাণ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট সব উদ্যোগ বাতিলের দাবি জানান।
এর আগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সংগঠনের পক্ষ থেকে আট দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

ইমাম ওলামা পরিষদের জেলা সেক্রেটারি মুফতি মানছুর রহমান খান লিখিত বক্তব্যে বলেন, “জনশ্রুতি অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সর্ববৃহত্তম রাম মূর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভুতি সৃষ্টি করেছে। রংপুর বিভাগের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অঞ্চলে এত বৃহৎ মন্দির ও বাহিরে রিসোর্ট স্পট বানিয়ে সেখানে প্রকাশ্যে মূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজান, সামাজিক অস্থিরতা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।”

তিনি বলেন, “এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা সম্পর্কে বিভিন্ন মহলে নানা অভিযোগ, বিতর্ক ও প্রশ্ন বিদ্যমান রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে উগ্রবাদী আচরণসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা ও প্রকৃত অবস্থা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।”

তাদের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- নির্মাণাধীন ওই বৃহৎ রাম মূতি প্রকল্পের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস, ব্যয়ের পরিমাণ, দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্যাদি আইনানুগভাবে তদন্ত ও নিরীক্ষার আওতায় আনা, কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা বা ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থায়ন, প্রভাব বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা তা গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা।
প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িকতা সম্প্রীতির জন্য কোনো ঝুঁকি রয়েছে কিনা তা বিশেষভাবে তদন্ত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিযোগসমূহ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ওই প্রকল্পের সাথে বিদেশি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ বা আলোচনা সত্য কিনা তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হোক, তদন্তে যদি কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ, অনভিপ্রেত প্রভাব বিস্তার বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভুত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিদেশি মিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও ব্যাখা চাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং গাইবান্ধা জেলা ও রংপুর বিভাগের শান্তি-শৃঙ্খল, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সকল কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ইমাম ওলামা পরিষদের জেলা সভাপতি মুফতি মাহমুদুল হাসান কাসেমী, জেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা আব্দুল বাসেত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জেলা সভাপতি আব্দুল মাজেদ, খেলাফত মজলিস জেলা সভাপতি মুফতি ইউসুফ কাসেমী, পলাশবাড়ী ওলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা ছাদেকুল ইসলাম।

এদিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শুক্রবার দুপুরে পলাশবাড়ীতে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি করে উপজেলা ইমাম ওলামা পরিষদ।

এ সময় বক্তারা বলেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই রাম মূর্তি অপসারণ ও মূর্তি নির্মাণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা না হলে কঠোর আন্দোলন ঘোষণা করা হবে।

এতে বক্তব্য দেন সংগঠনের উপজেলা সভাপতি মাওলানা ছাদেকুল ইসলাম, সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ হেফাজতে ইসলামী উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা শাহ আলম ফয়েজি, উপজেলা জামায়াত নেতা ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবু তালেব মাস্টার, জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা ও খাইরুল ইসলাম চান।